পর্ব:
৩
মানবজাতির
খুম্ভকর্ণদের তালিকায় সর্বশ্রেষ্ঠ যদি কাউকে বেছে নিতে হয় তাহলে অনায়াসেই লালের
নাম নেওয়া যায়। আজকের পরিবর্তে অন্য যেকোনো দিন হলে তার ঘুম ভাঙানোর জন্যে চারটে
অ্যালার্ম আর মায়ের ভীষণ তিরস্কারও কম পরে যায়। এমন নিশ্চিন্তে 'ডেড বডির' মতো যে কেউ বেলা অবধি ঘুমাতে পারে তা
আমাদের লাল কুমারকে না দেখলে বিশ্বাস করা ভার। প্রত্যেক দিন লালের মা, শ্রী রুমা দেবীকে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়
তার এই রোগা কুম্ভকর্ণটিকে ঘুম থেকে জাগাতে। সকাল সকাল মায়ের চিৎকার তার কর্ণগোচর
না হলেও মনেহয় গোটা পাড়ার লোক নিশ্চই শুনতে পায়।
অবশ্য
আজকের দিনটা লালের জীবনের অন্য যেকোনো দিনের থেকে অনেকটাই আলাদা। হিমালয়ে তপস্যায়
রত সাধুরাও হয়তো সাধনার পূর্তিতে এতো খুশি অনুভব করতে পারে যা আজ লাল করছে।
অ্যালার্ম বাজার অনেক আগে থেকেই সে নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিজের ঘরের ঘুরন্ত
সিলিং ফ্যানটার দিকে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে নিজের মনের ক্যানভাসে এঁকে চলেছে একের পর
এক চিত্র, যা সমস্তটাই শুধু সেই একটি মানুষকে
কেন্দ্র করে। এই সংক্ষিপ্ত জীবনে যে এমন দিন আসবে তা কোনোদিন ভাবতেই পারেনি লাল।
তার জীবনে যে প্রেম নামক বিষয়টি কোনোদিন আকাশ-কুসুম কল্পনা থেকে বাস্তবায়িত হবে সেই
স্বপ্ন দেখার দুঃস্বাহস করতে পারেনি।
আচমকা
তার কল্পনার স্রোতে ব্যাঘাত হানলো তারই জননীর কণ্ঠস্বর, 'ও খোকা! আর কতক্ষন ঘুমোবি? এদিকে যে বেলা কতটা হয়েছে সে খেয়াল আছে? তাড়াতাড়ি .....' কথাটা শেষ করতে পারলেন না রুমা দেবী।
ঘরে ঢুকে লালকে খাটের ওপর বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে বসে থাকতে দেখে তার বিস্ময়ের
আর অন্ত রইলো না। নিজের মাতৃজীবনে বোধকরি এই প্রথম তিনি লালকে তার তিরস্কার ছাড়াই
ঘুম থেকে উঠতে দেখেছেন। 'বাব্বা! আজ সূর্য কোন দিকে উদয় হল রে?' আরো কিছু বলতে যাবেন তার আগেই লাল বেশ
কিছুটা ঝাঝিয়ে উঠে বলল, 'সকাল বেলা এতো চিৎকার করছো কেন?! সক্কাল সক্কাল কানটা একেবারে ঝালাপালা
করে দিলে!' সাধারণত সহজে রেগে যাওয়ার পাত্র লাল নয়, কিন্তু মায়ের ডাকাডাকিতে তার প্রেমের
জোয়ারে যে বাঁধ বেঁধে ফেললো সেটাই এই অনর্থক ক্রোধের উৎস। ছেলে যে অল্পে রাগার
মানুষ নয় তা রুমা দেবী খুব ভালো ভাবেই জানতেন, তাই
কথা না বাড়িয়ে আবার নিজের সাংসারিক কাজে ফিরে যেতে উদ্দত হলেন তিনি। শুধু যাওয়ার
আগে হুকুম করে গেলেন, 'ঘুম যখন ভেঙেই গেছে তখন স্নানটা সেরে
বাজার থেকে কটা জিনিস নিয়ে আয়।'
মাথা
থেকে রাগ আর বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে মাতৃআদেশ পালন করতে প্রস্তুত হল লাল। প্রতিদিনের
অভ্যেস মতো স্নান সেরে ঠাকুর ঘরে ঢুকলো প্রণাম করতে। ভগবানকে মনে মনে অসংখ্য
ধন্যবাদ জানিয়ে সে রেডি হল বাজারে যাওয়ার জন্যে। জামার বোতাম আটকাতে আটকাতে সিঁড়ি
দিয়ে নামার সময় মায়ের হাত থেকে বাজারের ফর্দটা নিয়ে সবে বেরিয়েই যাচ্ছিলো, এমন সময় আবারো মায়ের গলা কানে গেলো, 'ফর্দটা তো নিয়ে যাচ্ছিস কিন্তু বাজারের
জিনিসগুলো কি প্যান্টের পকেটে করে নিয়ে আসবি? ব্যাগটা
কে নেবে?' যথারীতি সে ব্যাগটা সংগ্রহ করে সাইকেল
নিয়ে রওনা হল হরিতলা মার্কেটে।
আজ
মনমেজাজ বড়োই ভালো লালের,
আর হবে নাই বা কেন, আজ যে আবার দেখা হবে তার সাথে, বলা হবে মনে জমে থাকা অনেক অব্যাক্ত
কথা। এই আকাশ কুসুম কল্পনায় সে এতটাই ডুবে গেছিলো যে আরেকটু হলেই একটি টোটোর সাথে
ধাক্কা লাগতো। নিজের অসতর্কতায় কিছুটা ভয়ই পেয়েছিলো লাল, কাজেই এবার সম্পূর্ণভাবে মনোনিবেশ করলো
সাইকেল চালানোয়। বাজার করা প্রায় শেষের মুখে এমন সময় তার নজর আটকে গেলো দোকানে
ঝুলতে থাকা একজোড়া কানের দুলের ওপর। 'এই
দুলটা পড়লে বেশ মানাবে ওকে ', অস্ফুট
স্বরে নিজের অজান্তেই বলে উঠলো লাল। একবার মনেও হল যে কিনে নিয়ে যাই দুলটা, কিন্তু পরক্ষনেই ভাবলো এতো তাড়াতাড়ি
এসব করা হয়তো ঠিক দেখাবে না। মুচকি হেসে সে এগিয়ে চললো সোজা বাড়ির দিকে।
বাজারের
ব্যাগটা রান্নাঘরে রেখে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় দেখা মিললো মিনির। মিনি হল রায় বাড়ির
পোষা বেড়াল। গতবছর কোনো এক গাছতলা থেকে লাল তুলে নিয়ে আসে সদ্য মা-হারা বিড়াল
ছানাটিকে। খুব ছোটবেলা থেকেই এই অবলা জীবেদের প্রতি বড্ডো মায়া লালের, কোথাও কোনো অসহায় কুকুর, বিড়াল দেখলে সে তার সর্বসামর্থ প্রয়োগ
করে তাদের সাহায্যের জন্য। দুধের মতো
ফর্সা পশম, কালো লেজ, আর গলায় বাঁধা একটা লাল কলার, যেটার ঝুলতে থাকা ছোট্ট বেল-টা জানান
দেয় মিনির আগমনের। লালকে আসতে দেখে ম্যাও ম্যাও করে ডাকতে থাকে মিনি, তারপর তার পায়ের সাথে গা ঘষে ঘুরতে
থাকে লালের চারিপাশে।
মাথায়
সস্নেহে হাত বুলিয়ে দেয় লাল। 'কিরে
মিনি? কোথায় ছিলিস এতক্ষন? আবার পাশের বাড়ির কুকুরটার সাথে ঝগড়া
করতে যাসনি তো?' নিজের মানবরূপী বন্ধুর প্রশ্নের উত্তরে
মিনি এমন সম্মতিসূচকভাবে ঘাড় নাড়লো যেন সে সবই বুঝতে পারে। আদরের খিদে মিটে যাওয়ায়
এক দৌড়ে বিড়ালটা সোজা চলে গেলো রান্নাঘরের দিকে। গোটা বাড়িতে মনেহয় এই একটাই
প্রাণী আছে যে প্রতিদিন খোঁজ নিতে আসে রুমা দেবীর, তা সে মাছের লোভেই হোক অথবা অভ্যাসের দোষে।
নিজের
ঘরে ঢুকে ঘামে ভেজা জামাটা পাল্টে আরেকবার গা ধুতে বাথরুমে গেলো লাল। বেরিয়ে এসে
টেবিল থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে আবারো নিজের দেহটিকে নিক্ষেপ করলো বিছানার উপর। ফোন
অন করেই খুলে ফেললো ইনস্টাগ্রাম, আর
আঙ্গুলগুলো যেন কোনো যান্ত্রিক নির্দেশে 'প্রিয়া
দাস' নামটা টাইপ করে নিলো সার্চ-বার এ।
অসংখ্য প্রিয়াদের মধ্যে কোনটা যে তার মিষ্টির প্রোফাইল তা খুঁজে বের করতে খুবএকটা
সময় লাগলো না লালের। প্রোফাইলটা খুলে দেখতে থাকলো তার পোস্টগুলো। ছবিগুলো স্ক্রোল
করার সময় আশ্চর্য মাদকতা অনুভব করতে থাকলো লাল, আর
তার সঙ্গে যোগ দিল তার বাড়তে থাকা হার্টবিট। খানিক্ষন কিছু একটা ভেবে অবশেষে
পাঠিয়েই দিল ফলো রিকোয়েস্ট। তারপর ফোনটা বুকের ওপর সযত্নে রেখে ডুবে গেলো নিজের
কল্পনার জগতে। চিন্তা সাগরের ঢেউয়ে হাবুডুবু খেতে খেতে কখন যেন ঘুমিয়েই পড়লো লাল, ঘুম ভাঙলো ফোনের রিংটোনে। বুকের উপর
রাখা ফোন ওরম হঠাৎ বেজে ওঠায় চমকে উঠে বসলো খাটে। স্ক্রিনের উপর ভেসে ওঠা নামটা আর
কারোর নয়, তার নিজের বন্ধু বিজয়ের, যা তার ফোন এ "চিংড়ি" বলে
সেভ করা। এমন অদ্ভুত নাম রাখার কোনো ইতিহাস জানা নেই কারোর, হয়তো বা এমনিই মজার ছলে রেখেছিলো। আর
দেরি না করে কল তুলে বলল,
"বল ভাই"।
"আমি আর কি বলবো? বলবি তো তুই। আজ একটা এতো বিশেষ দিন
বলে কথা!"
বন্ধুর
ব্যাজ্ঞপ্তিকে কোনোরকম পরোয়া না করেই বাড়ির নতুন বৌয়ের মতো হাসি মাখা কণ্ঠে লাল
বলল, "সে আর বলতে? সকাল থেকেই মনটা কেমন যেন উড়ে
বেড়াচ্ছে। দিনটা যে কখন শেষ হবে আর সন্ধ্যে নেমে আসবে সেই অপেক্ষায় কোনোরকমে সময়
কাটাচ্ছি আরকি। "
"হুম হুম, সবই বুঝছি। এতে তোর কোনো দোষ নেই যদিও, এ হল বয়েসের দোষ।"
"তুই থাম তো ! একদম ওই ক্লাবে বসে থাকা
বুড়ো দাদুদের মতো কথা বলবি না। এমন করে বলছিস যেন তোর কোনোদিন কাউকে ভালো লাগেনি।
"
একটা
ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, কতকটা বলিউডের ডিপ্রেসড প্রেমিকের মতো
বিজয় বলল, "তা বটে। কিন্তু আমার গল্পগুলো সব
একতরফা।.... যাই হোক ছাড় সেসব কথা। আজকে কি করবি কিছু ভেবেছিস?"
"না রে ভাই, তেমন কিছুই ভাবিনি। যা হবে দেখা যাবে।
"
"ঠিক আছে। তাহলে এখন রাখছি, আবার রাতে কথা হবে। আজ যা যা ঘটবে সব
কিন্তু বিস্তারে শুনবো। গুড লাক!", কথাটা
বলেই কল কেটে দিল বিজয়।
ফোন
রেখে, চোখ ডলতে ডলতে একবার মাথা তুলে তাকালো
লাল, ঘড়িতে দেখাচ্ছে এখন দুপুর ১ টা। খেতে
বসার সময় হয়ে এসেছে, তাই আর কাল বিলম্ব না করে সে চললো
খেতে।
খাবার
শেষে দুদণ্ড ভাত ঘুম দেয়না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া বড়োই কঠিন। আমাদের লালও এর
ব্যাতিক্রম নয়, প্রতিদিনের অভ্যেস মতো আজকেও গিয়ে শুয়ে
পড়লো বিছানায়। এসি চালিয়ে,
কানে হেডফোন টা গুঁজে চালিয়ে দিল অনুপম
রায়ের গান - 'তুই চিরদিন, তোর দরজা খুলে থাকিস ....'
বিকেল
হয়ে এসেছে, সূর্য এখন পশ্চিমের আকাশে অগ্রসর হচ্ছে
সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। ঘড়িতে সময় এখন বিকেল পাঁচটা। লাল
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পাক্কা সাত-আট মিনিট ধরে চুল আঁচড়ে যাচ্ছে। আজ পরনে অন্যদিনের
মতো একটা পুরোনো টিশার্ট আর ট্রাকপ্যান্ট নয়, রয়েছে
গত মাসের কেনা নতুন নীল জিন্স আর সবুজ রঙের ভি-নেক টিশার্ট, সাথে হাতে ঝুলছে মেটাল রিস্ট ওয়াচ।
যাওয়ার আগে নিজেকে একবার শেষ বারের মতো দেখে নিলো আয়নার ধুলো জমে যাওয়া কাঁচে, তারপর গায়ে পর্যাপ্ত পরিমানে ডিওডরেন্ট
মেখে নেমে গেলো সদর দরজার দিকে।
বারাসাত
স্টেশন তার বাড়ির থেকে মাত্র সাত মিনিটের দূরত্বে, কাজেই অল্পক্ষনেই পৌঁছে গেলো সে ঠিক বাবলুদার চায়ের দোকানের সামনে।
গত তিন-চার মাস ধরে এইটাই হয়ে উঠেছে তার রুটিন। লাল বাবলুদার অতি পরিচিত গ্রাহক, তাই তাকে দেখে অন্য যেকোনো দিন অবাক
হওয়ার কোনো কারণই ছিল না। কিন্তু আজকে লালের পোশাক দেখে এবং গা থেকে আশা পারফিউমের
গন্ধে বেশ কিছুটা অবাকই হল বাবলুদা। এই অতিরিক্ত আয়োজনের হেতু বুঝতে অবশ্য কোনো
অসুবিধা হল না তার। লাল কিছু বলার আগেই বাবলুদা, যথাসম্ভব নিজের বিকট হাসি গোপন করে, তার হাতে তুলে দিল একটা গোল্ড ফ্লেক। সিগারেট টা জ্বালিয়ে এবার চললো
সেই অপেক্ষা। তবে আজকের অপেক্ষার বিষয়টা আগের থেকে অনেক আলাদা। আজ আর তাকে লুকিয়ে
থেকে দেখতে হবে না মিষ্টিকে। তার সাথে কোনো দ্বিধা ছাড়াই কথা বলার অধিকার এখন আছে
লালের। আর এটাই হয়তো তার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণ।
আকাশে
বেশ মেঘ করেছে, মনেহয় বৃষ্টি হবে, তারপর আবার ছাতাও আনতে ভুলে গেছে লাল।
বৃষ্টি যেকোনো মুহূর্তে নামতে পারে এসব ভাবতে না ভাবতেই কয়েক ফোটা জল এসে পরতে
লাগলো মাথায়। বৃষ্টি পরছে! বেশি সাত-পাঁচ না ভেবে তড়িঘড়ি গিয়ে উঠলো প্লাটফর্ম ১ এ।
প্লাটফর্মের ওভারব্রিজের পাশে শেডের নিচে খালি পরে থাকা একটা সিটে গিয়ে বসলো লাল।
বৃষ্টির বেগ ক্রমশ বাড়ছে,
আর তার সাথে বাড়ছে হাওয়ার প্রকোপ।
"সর্বনাশ! এ তো ঝড় উঠেছে ! ", আকাশে ভাসতে থাকা শ্যামবর্ণ মেঘের
প্রতি চেয়ে বলে উঠলো লাল। গরমের প্রচন্ড প্রকোপের পর এই ঝড়ের ঠান্ডা হাওয়া বেশ
ভালো লাগছে তার। এই শীতল হাওয়া যেন সৃষ্টি করছে এক মনোরম পরিবেশের। ঠিক এই ধরণেরই
তো হয় সিনেমা জগতের নায়ক-নায়িকার সাক্ষাৎ। কথাটা ভেবেই যেন সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে
উঠলো।
এসবই
ভাবছিলো লাল, এমন সময় ঠিক চোখের সামনে এসে দাঁড়ালো
শিয়ালদাহ লোকাল, যে ট্রেনে আসার কথা মিষ্টির। চোখ গুলো
পরোক্ষ ভাবে খুঁজে চললো তাকে, ট্রেন
থেকে নামা মানুষের ভিড়ে। অবশেষে দেখা মিললো তার, চোখাচোখি হতেই হাতটা তুলে তাকে শেডে আসার ইঙ্গিত করলো লাল। বৃষ্টিতে
ভিজতে ভিজতে মিষ্টি দ্রুত গিয়ে দাঁড়ালো শেডের তলায়, লালের একেবারে সম্মুখে। মিষ্টির পরনে আজ একটা অতি সাধারণ কিন্তু
সুন্দর চুড়িদার, হাতে স্পটিক পাথরের ব্রেসলেট, আর কাঁধে একটা ছোট্ট সাইড-ব্যাগ। হালকা
ভিজে যাওয়া চুলগুলোয় হাত বুলিয়ে কিঞ্চিৎ মিথ্যে দুঃখ প্রকাশ করে মিষ্টি বলল, "ইশ! মাথাটা একেবারে ভিজে গেছে। এদিকে
আবার ছাতাটাও আনতে ভুলে গেছি। এই ওয়েদার ফোরকাস্ট গুলো কোনো কাজের না, সব....." আরো অনেক কিছুই বলে গেলো
মিষ্টি। কিন্তু আমাদের লালের কানে বোধহয় সেসব কিছুই প্রবেশ করলো না।
মিষ্টির
ভেজা কেশরাশি, ঠান্ডা হাওয়া, আর বৃষ্টির অল্প ছিটে যেন সৃষ্টি করেছে
এক অন্য জগতের। দেবরাজ ইন্দ্রের স্বর্গেও এমন মনোরম পরিবেশ আছে কি না বুঝে ওঠা
ভার।
পর্ব:
৪
কিছুটা
উদ্বিগ্ন হয়ে, নিজের পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে
এগিয়ে দিল মিষ্টির সম্মুখে।
"এই নাও, এটা দিয়ে মুখ আর মাথাটা মুছে নাও। এই ওয়েদারে অমন ভিজে থাকলে শরীর
খারাপ করবে।" স্বলজ্জ হাসি মুখে রুমালটা লালের হাত থেকে নিয়ে মুখ মুছে নিলো
সে। মুগ্ধ হয়ে লাল তাকিয়ে থাকলো তার মুখের দিকে। এতো কাছ থেকে আগে কখনো উপলব্ধি
করার সুযোগ হয়নি মিষ্টির সুন্দর মুখটিকে। স্কুলে লাস্ট বেঞ্চ থেকে উঁকি মেরেই হোক
বা স্টেশনের ল্যাম্প পোস্টের আড়ালে দাঁড়িয়েই হোক, মিষ্টিকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা এই বুঝি প্রথম। প্রত্যেক মুহূর্ত
যেন লালের নবীন হৃদয়ে সৃষ্টি করছে উৎফুল্লতা।
লালের
হতবাক দৃষ্টি চোখ এড়ায়নি মিষ্টির। তারও মনে যে পুলক জেগেছে তা অস্বীকার করার
স্বাধ্য এই সদ্য কুড়ির ঘরে পা দেওয়া তরুণীর ছিল না।
রুমালের
জন্যে ধন্যবাদ জানিয়ে যখন মিষ্টি হাত বাড়িয়ে দিল তখন যেন হঠাৎ সম্মতি ফিরে
পেল লাল। ব্যাপারটা কিছুটা অনুমান করতে
পেরে আবারো হাসির রেখা ফুটে উঠলো প্রিয়ার মুখে। বৃষ্টির রিমঝিম ধারায় মনের
অব্যাক্ত গোপন রহস্যগুলো মনেই ঢেকে রেখে নির্বাক দৃষ্টিতে দুজনে তাকিয়ে থাকলো
একেঅপরের দিকে। দূর থেকে ওদের দুজনকে দেখলে মনে হবে যেন কোনো বাংলা চলচ্চিত্রের
ক্যামেরা বন্দি প্রেমিক-প্রেমিকার ছবি।
একেঅপরের
চোখের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে যেন কত কথা পড়ার চেষ্টা করছিলো
দুজনে। এইভাবে অনেকটা সময় কাটার পর বোধ করি লজ্জার ভাব স্পষ্টতা পেয়েছিলো দুই মনে, তাই আচমকা কিছুটা পিছিয়ে এসে একটা
ফাঁকা বেঞ্চের উপর উপবেশন করলো লাল।
"এই ঝড় থামতে সময় লাগবে বলে মনে হচ্ছে।
ততক্ষন নাহয় এখানেই বসা যাক। ", কতকটা
সেকেলে উদাসীন কবিদের মতো গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো লাল। এমনি বিজ্ঞ ভাব নিয়ে সে
কথাগুলি বলল যেন আকাশে মেঘের রং দেখেই বৃষ্টির স্থায়িত্ব অনুমান করে ফেলা তার
পক্ষে ছেলেখেলা। লালের মুখের গাম্ভীর্য এবং কথা বলার ভঙ্গির প্রথাবিরুদ্ধ মিশ্রণ
দেখে নিজের হাসি আর চেপে রাখতে পারলো না মিষ্টি। হাসতে হাসতে তার এমন অবস্থা যে
আরেকটু হলে বুঝি মাটিতেই পরে যেত। হাসির দাপটে কোনোরকমে নিজের টাল সামলে লালের
পাশে বেঞ্চের অবশিষ্ট খালি জায়াগায় ধপ করে বসে পড়লো মিষ্টি।
ওদিকে
হতবম্ব ছেলেটা মিষ্টির এমন উল্লাসের হেতু নির্ধারণ করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলো আর
জিজ্ঞেস করলো, "এই! এই! হাসছিস কেন এরম পাগলের মতো? আমি কি এমন বললাম?.... আরে থাম রে বাবা। "
লালের
কণ্ঠস্বরে চাপা কপট রাগ এবং লজ্জার ছাপ স্পষ্ট অনুভব করলো মিষ্টি। কাজেই কোনোমতে
নিজের অফুরন্ত হাসির গতি থামিয়ে পরিস্থিতির সামাল দিতে, আর তার সঙ্গে লালের গুরুগম্ভির মুখের
আকৃতি আবার আগের মতো করার উদ্দেশ্যে মিষ্টি বলল, "আরে ও কিছু না। তুই কথাটা কেমন একটা সিরিয়াস হয়ে বললি, তাই দেখেই একটু হাসি পেয়ে গেলো। "
"একটু হাসি? এইটা যদি তোর একটু হাসি হয় তাহলে এখনো
ওরম মুখের ওপর হাত রেখে হাসি চাপছিস কেন ?"
"কেলো করেছে.... এ তো রেগে যাচ্ছে মনে
হয়। আর আমিও পারি বটে।... হাসি থামছে না কেন?!!", কিছুটা বাতিকগ্রস্তের মতো মুখ চেপে কোনোমতে নিজের অবশিষ্ট হাসি
থামাতে থামাতে নিজের মনেই বলে উঠলো মিষ্টি।
মুখটা
বাংলার পাঁচের মতো করে রাখলেও মনে যে তার আনন্দের ফোয়ারা ছুটছে তা লাল বাদে আর কেউ
জানুক বা না জানুক আমাদের পাঠকশ্রেণীর লোকজন বোঝে, তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।
বৃষ্টির
বেগ থেমেছে অনেকটাই, কমেছে ঝড়ের দাপট। আর এইভাবে প্লাটফর্মে
বসে সময় নষ্ট করা এই অতি মূল্যবান সময়ের অপচয় বলে মনে হতে লাগলো দুজনেরই।
"বৃষ্টি প্রায় থেমেই গেছে। এবার বেরোলে
কোনো রিস্ক নেই, কি বলিস? "। কথাটা বলে জিজ্ঞাসু মুখে সে তাকালো মিষ্টির দিকে। ছোট্ট শিশুর মতো
মাথাটা একদিকে কাত করে সম্মতি জানালো সে। তারপর দুজনে খুব সাবধানে, সিঁড়ির কাদা আর জল এড়িয়ে, নেমে এসে দাঁড়ালো স্টেশন চত্বরে।
"কোথায় যাবি?" প্রশ্নটা শুনতে খুবই স্বাভাবিক এবং
অবশ্যম্ভাবী মনে হলেও এই সাধারণ প্রশ্নই যেন লালকে কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূড় করে
তুললো। বিগত তিন-চারদিন ধরে সে অনেককিছু আকাশ কুসুম কল্পনা করেছে ঠিকই কিন্তু
বাস্তবে পরিকল্পনা করার কথা একবারও মাথায় আসেনি তার। "কোথায় যাবো?", কি বলবে বুঝতে না পেরে তারই প্রশ্নটি
পুনঃ উচ্চারণ করে সামনের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে দ্রুত এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে লাগলো।
প্রত্যেক
সন্ধ্যেবেলা এখানে বাজার বসে, আর
রবিবারে যেন মানুষের কোলাহল একটু বেশিই হয়। বৃষ্টির দৌলতে যে কাদার স্তর জমেছে, রাস্তার দুই ধারের সেই কাদা মাড়িয়ে এখন
কোথায় যাওয়া যেতে পারে এই প্রশ্নটা অস্বস্তিতে ফেলেছে লালকে। বর্ষাকালের ভেজা
রাস্তা আর কাদা কোনোদিনই ভালো লাগে না তার।
ইতিমধ্যে
মিষ্টি একটি রাস্তার দিকে এগিয়ে লালকে ডেকে বলে, "এই রাস্তা ধরে এগোতে থাকি। বাকিটা নাহয় হাটতে হাটতেই ভেবে নেওয়া
যাবে। " প্রস্তাবটা মন্দ নয়। কিছুটা সময় কাটানোই তো তাদের উদ্দেশ্য, কাজেই এই ক্ষেত্রে স্থানমাহাত্য নেই
বললে খুবএকটা ভুল হবে না।
এরপর
দুজনে হাটতে থাকে পাশাপাশি,
কথা নেই দুজনের মুখেই। কি বলবে ভেবে না
পেয়ে আর দুজনের মধ্যে নিস্তব্ধতা কাটানোর খাতিরেই অতি সাধারণ একটা প্রশ্ন করে বসলো
লাল , "তোর বৃষ্টি ভালো লাগে রে ?"
মুখের
দিকে না তাকিয়ে কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে মিষ্টি উত্তর দিল, "হ্যা, খুব ভালো লাগে।" কিছুটা থেমে আবার বলতে থাকলো, "যখন অনেক ছোটো ছিলাম, বৃষ্টি পড়লেই মায়ের কাছে ভূতের গল্প
শুনতাম। তখন বাড়িতে ইনভার্টার ছিল না আর বৃষ্টি হলেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া
খুব সাধারণ ঘটনা ছিল। অন্ধকার ঘরে মায়ের কোলে বসে মুগ্ধ হয়ে শুনতাম সেইসব আজগুবি
ভূতের গল্প। " কথাগুলো বলতে গিয়ে মনটা একটু খারাপ হয়ে গেলো তার।
তার
মনের পরিস্থিতি বুঝতে পেরে করুণা মাখানো স্বরে লাল জিজ্ঞেস করলো, "বৃষ্টি হলে মায়ের কথা খুব মনে পরে বল ?"
চোখের
কোন থেকে অজান্তেই গড়িয়ে পড়লো এক ফোটা অশ্রু। ডান হাত দিয়ে দ্রুত চোখের জল মুছে
নিলো মিষ্টি। বিষয়টা লক্ষ্য করে যেন ভারী অপ্রস্তুত হয়ে গেলো লাল। মা হারা এই
মেয়েটাকে অহেতুক কষ্ট দিয়ে ফেলে অনুতপ্ত হয়ে লাল ক্ষমা চাইলো তার কাছে।
"আরে না না। এতে সরি বলার কিছু নেই।
আসলে বৃষ্টি পড়লে এমনিতেই আমার মায়ের কথা খুব মনে পরে। তাই একটু ইমোশনাল হয়ে
গেছিলাম আরকি। " মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে আনার বৃথা চেষ্টা করে বলল মিষ্টি।
" স্কুল শেষ হওয়ার পর আর তো কোনো কথাই হয়নি। কি করছিস আজকাল ?"
"আমি পড়াশোনায় বরাবরই কাঁচা, তাই উচ্চমাধ্যমিকের পরে আর পড়াশোনার
জগতে ফেরার কোনো ইচ্ছেই ছিল না। বাবার কাঠের ব্যবসা। এখন সেইসব নিয়েই দিন
কাটাই।"
ওপার
থেকে আর কোনো কথা আসছে না দেখে আজ আবারো আইসক্রিম খাওয়ার প্রস্তাব দিল লাল।
সাধারণত বাইরের খাবার খাওয়ার খুবএকটা শখ কোনোদিনই ছিলোনা লালের, কিন্তু মিষ্টির সাথে কি কথা বলা
উপযুক্ত হবে তা তার ওই সহজ সরল মগজে এলো না কোনোমতেই। অগত্যা খাওয়ার প্রস্তাব এই
পরিস্থিতিতে শ্রেয় হবে সেটাই স্বাভাবিক বলে ধারণা হল তার।
এরমভাবে
বেশ কিছুক্ষন এইসব অতিসাধারণ কথাবার্তার মধ্যেই কেটে গেলো সন্ধ্যে। যেসব মনের কথা
বলার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিলো সেসব কিছুই আর বলা হল না। কিন্তু একটা কাজের মতো কাজ
হল, সে মিষ্টিকে আরো ভালো ভাবে বুঝতে শুরু
করেছে এখন। মেয়েটার উজ্জ্বল হাসির আড়ালে যে অন্ধকার অতীত লুকিয়ে আছে তা বুঝতে ভুল
হয়নি লালের।
তাই
বিদায় বেলায় শুধু একটাই কথা বলল সে মিষ্টিকে, "তোর জীবনের ভালো সময়ে আমাকে রাখতে না পারলেও অন্তত জীবনের কষ্টটা
আমাকে কিছুটা দিস।"
এই
সামান্য উদ্বেগ মিশ্রিত আশ্বাসের মধ্যে যে কি জাদু ছিল তা ঠিক ঠাহর করতে পারলো না
মিষ্টি, শুধু অনুভব করলো সামনে করুন মুখে
দাঁড়িয়ে থাকা জটিলতাশুন্য ছেলেটির নিষ্পাপ স্নেহ আর ভালোবাসা।
ফেরার
সময় ট্রেন এ উঠে একবার ফিরে তাকালো সেই ল্যাম্প পোস্টের দিকে। হ্যা, সে এখনো দারিয়ে আছে ঠিক তার দিকেই
তাকিয়ে। ট্রেন ছেড়ে দিতেই ধীরে ধীরে দেওয়ালের পিছনে মিলিয়ে গেলো লালের চেহারা। ফোনে
ইয়ারফোন কানেক্ট করে গান শুনতে থাকলো মিষ্টি- 'এরা
সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না ...'
তার
মুখে আনন্দ ও শান্তির চিহ্ন স্পষ্ট।
ভালোবাসার
নাম করে মানুষ শুধু সুখটাই চায়। কিন্তু এই ছেলেটার মধ্যে যেন কিছু আলাদা রয়েছে। সে
চায়নি সুখ, সে চায়নি তার সময়, সে শুধু ভাগ করে নিতে চেয়েছে তার
জীবনের দুঃখটুকু। এমন মানুষ আজকের দিনে সত্যিই বিরল।

No comments:
Post a Comment