পর্ব ১
"উফ! বড্ডো মশা! মেরেই ফেলবে পারলে। ", বিরক্ত হয়ে, হাঁটুর ওপর হাত বোলাতে বোলাতে বলে উঠলো লাল। বারাসাত স্টেশনের প্লাটফর্ম ১ এর সামনের গলিতে প্রত্যেক সপ্তাহে রবিবার আর বুধবার দাঁড়িয়ে থাকে লাল। এটা তার অনেকদিনের অভ্যেস। না না , সে কোনো কার্য উদ্ধারের জন্যে ওরম জায়গায় মশার কামড় খাবার জন্যে সন্ধ্যে-বেলা
দাঁড়িয়ে থাকে না, অনর্থক সময় নষ্ট করার মতো ছেলে সে নয়। কিন্তু প্রয়োজন তার একটা আছে বৈকি।
আজ প্রায় চার মাস হয়ে গেছে লালুর এই অদ্ভুত সন্ধ্যা ভ্রমণের। শুধু মাত্র একজনকে একটা ঝলক দেখবে বলে তার এতো কীর্তি। অল্পবয়সের নবীন প্রেম খানিকটা এই ধরণেরই হয় , এর বিশেষ কোনো হেতু থাকে না, থাকে না কোনো হিসেব, যেটা থাকে সেটা হলো শুধু একটা অকৃত্রিম ভালো লাগা।
মেয়েটার নাম প্রিয়া দাস, ডাক নাম মিষ্টি। একই স্কুলে পড়তো দুজনে। তার ভালো নামের থেকে তার ডাক নামটাই বেশি পছন্দের লালুর। মিষ্টি কোনোদিনও লক্ষ্য করেনি তাদের ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চ-এ বসে থাকা নিরীহ, শান্ত এই ছেলেটিকে যার দুই চোখ এক দৃষ্টে চেয়ে থাকতো তার ভালোবাসার সেই মানুষটার দিকে।
মেয়েটাকে সত্যিই ভারী সুন্দর এবং মিষ্টি দেখতে। সুন্দর কাজল লাগানো পটলচেরা দুই জোড়া চোখ, গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁট, প্রশস্ত ললাট এবং গোলাপি আভা মাখানো ফর্সা দুই চিবুক, যেন সাক্ষাৎ লক্ষী প্রতিমা। এই দেবীরূপী 'লক্ষী প্রতিমা ' ঝড় তুলেছিল লাল এর তরুণ হৃদয়ে। রোজ তাকে এক মুহূর্ত না দেখলে দিন কাটতো না লালের।
স্কুল জীবনের পাঠ চুকে গেছে আজ ছয় মাস হলো। কাজেই রোজ রোজ তার দর্শন লাভ করা আর সম্ভব নয় লালের পক্ষে। তাই প্রতি রবি এবং বুধবার দাঁড়িয়ে থাকে সে এই স্টেশন চত্বরে কারণ এইদুইদিন মিষ্টি টিউশন থেকে ফেরে ট্রেন ধরে।
ছোটবেলা থেকেই লালের লেখাপড়ায় খুব একটা মন ছিল না, তাই উচ্চ-মাধ্যমিকের পর সে যোগ দেয় বাবার ব্যবসায়। অপরদিকে মিষ্টি মেয়েটা অল্পায়ু থেকেই ছিল অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী। উচ্চ মাধ্যমিক এ ৯৬% নম্বর পেয়ে জেলায় প্রথম হয়েছিল। কাজেই বলা বাহুল্য যে মিষ্টি নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গেছে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আসায়।
স্কুল এ পড়াকালীন মিষ্টির কোনোদিনই খুবএকটা নজর যায়নি লালের প্রতি। আর যাবেই বা কেন? কিছুই বিশেষ তো ছিল না এই শীর্ণকায়, অল্পভাষী, অদ্ভুত গোছের ছেলেটির মধ্যে। হয়তো বা লালের অস্তিত্বই সে টের পায়নি কোনোদিন। লাল ও কোনোদিন সাহস করে বলে উঠতে পারেনি তার মনের অব্যাক্ত কথাগুলি। তার অনেকবার মনে হয়েছে যে যাই গিয়ে একবার বলেই দেখি না, কি আর হবে? কিন্তু প্রেমের প্রস্তাব খারিজ হয়ে যাওয়ার ভয়ে এবং বন্ধুমহলে হাস্য কৌতুকের বিষয় হওয়ার লজ্জায় তাকে বাধা দিয়েছে প্রত্যেকবার।
সেই স্কুল লাইফ আর নেই, রয়ে গেছে তার না বলা কথাগুলো যা কেবল সে জানে আর জানেন বিধাতা। আজ ও লাল মনে সাহস জোগাতে পারেনি , তাই লুকিয়ে লুকিয়ে চালিয়ে গেছে তার অজানা , অকৃত্রিম এই প্রেমকাহিনী।
নিজের স্বপ্নের রাজ্যে ভাসতে ভাসতে আর মশার নিদারুন অত্যাচার সামলাতে লাল ব্যস্ত, এমন সময় কানে গেলো ট্রেন এর এনাউন্সমেন্ট। এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে তার চোখ দুটি তড়িৎ গতিতে উঠে তাকালো প্লাটফর্মের সিঁড়ির দিকে। 'যাক বাবা, এতক্ষনে ভগবান একটু মুখ তুলে চাইলেন আমার দিকে। ' কিন্তু মিষ্টির দেখা সেদিন আর মিললো না। ট্রেন চলে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষন পর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও লাভ হলো না কোনো। মনটা হতাশ হয়ে গেলো লালের। তার মনের রাজকন্যাকে একবার দেখতে না পাওয়ার দুঃখ যে কতটা তা লিখে ব্যাক্ত করা কঠিন। বাবলুদার চায়ের দোকান থেকে একটা দশ এর গোল্ড ফ্লেক কিনে অবিলম্বে তা ধরিয়ে একটা টান দিলো লাল। সিগারেটের ধোয়ার সাথে সাথে বেরিয়ে এলো একটা দীর্ঘ্যশ্বাস।
'আজ বুঝি দিদিমনির দেখা মেলেনি ?', রহস্যজনক ভাবে হেসে জিজ্ঞেস করলো বাবলুদা। তার ওই প্রশ্নের মধ্যে লুকানো ব্যাঙ্গ বুঝতে খুবএকটা অসুবিধা হলো না লালের। তার সারা গা যেন জ্বলে গেলো। একেই এই রোমিও র মন বিরহ বেদনায় কাতরাচ্ছে, তারপর আবার এই কোদালের মতো দাঁত-ওয়ালা, কদাকার বাঁদরটা নির্লজ্জের মতো হাসছে ! স্পর্ধা তো কম নয়! কি নিষ্ঠূর এই মানব সমাজ! এইরম ভীষণ আঘাত হানার প্রত্যুত্তরে নিজের ক্রোধ প্রকাশ না করে লাল একগাল ম্লান হাসি হেসে বললো, 'না গো বাবলুদা, আজ আর তার দেখা পেলাম না । ' বলেই সিগারেটে টান দিতে দিতে সে সাইকেল নিয়ে এগিয়ে গেলো চাঁপাডালির দিকে।
সময়ের প্রবাহে আবারো এসে হাজির হলো বুধবার, আরো এক সুযোগ সেই রমণী কে দেখবার। দ্রুত গতিতে সাইকেল চালাতে চলতে ভাবতে থাকলো লালু, 'আজ আশা করি এক ঝলক দেখতে পাবো তাকে। ' হালকা করে ব্র্যাক চেপে দাঁড় করালো বাবার কিনে দেওয়া নতুন সাইকেলটা। ট্রেন আস্তে এখনো প্রায় আধ ঘন্টা দেরি কিন্তু এইবারের সুযোগ কোনোভাবেই হাতছাড়া করা সম্ভব নয়, তাই আগেভাগেই এসে প্রস্তুত আমাদের রোমিও। প্রতিদিনের মতো আজও সেই চিরপরিচিত ল্যাম্পপোস্ট-টার কিছুটা পিছনে দাঁড়িয়ে, পকেট থেকে লাইটার টা বের করে জ্বালালো একটা সিগারেট। সময় যেন আর কাটতে চাইছে না। এমনি যেকোনোদিন, যেকোনো পরিস্থিতিতে আধঘন্টা কাটানো এমন কোনো বড়ো ব্যাপার নয়। কিন্তু আজ যেন অপেক্ষার মুহূর্ত গুলো কাটতেই চাইছে না, বিধাতা যেন অকারণে এই কোমল হৃদয়টাকে কিঞ্চিৎ কষ্ট দেওয়ার জন্যেই সময়ের গতি থামিয়ে দিয়েছেন।
গভীর চিন্তায় মগ্ন লালের কানে যেই এনাউন্সমেন্ট এর আওয়াজটা গেলো,অমনি সে চোখ ভরা আকাঙ্খা নিয়ে নিজের দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সেই পুরোনো, ধুলো-মাখা সিঁড়িগুলির দিকে। এক অচেনা আশংকায় তার বুক কেঁপে উঠলো, 'আজ দেখা পাবো তো?'
লালের সেই করুন মুখ দেখে বুঝি ঈশ্বরের আজ একটু দয়া হলো। এইসব ভাবতে না ভাবতেই দেখা গেলো সেই চিরপরিচিত মানুষটিকে, যার ছায়া পর্যন্ত, মনে করি, লাল দূর থেকেই চিনতে পারবে। প্লাটফর্ম থেকে ধীরকদমে নেমে এলো মিষ্টি। পরনে হালকা হলুদ একটা টপ,নীল জিন্স, কানে দুটো ময়ূরের আদলে গড়ে তোলা ছোট্ট দুল, ঠোঁটে হালকা কমলা রঙের লিপস্টিক, আর পায়ে দুজোড়া রুপোর নুপুর, যার ঝুমঝুম শব্দ মুগ্ধ করতে পারে যেকোনো মানুষকে। যার দেখা পাওয়ার জন্যে এতো অপেক্ষা, এতো পরিশ্রম, তাকে দেখেও যেন মন ভরলো না লালের। কিছু যেন অন্যরকম মনে হচ্ছে সবকিছু, কই আগে তো কোনোদিন এমননটা মনেহয়নি লালের। লাল লক্ষ করলো মিষ্টির মুখে উদ্বিগ্নতার চাপ স্পষ্ট, যেন কোনো সমস্যায় পড়েছে মেয়েটা।
এইসব ভাবছিলো লাল, ইতিমধ্যেই ঘটে গেলো এক অভাবনীয় ঘটনা যা সে কোনোদিন ভাবতেও পারেনি। অন্যান্য দিনের মতো সোজা রাস্তা ধরে এগিয়ে না গিয়ে আজ মিষ্টির দৃষ্টি এসে পড়লো সোজা লালের ওপর। এই অসম্ভব ঘটনায় লাল এতটাই বিহঃশিত হয়ে পড়েছিল যে প্রথমে লাল ভাবলো সে ভুল দেখছে, কিন্তু একটু প্রকৃতিস্থ হতেই তার ভুল ভাঙলো। নাহ, মিষ্টির দৃষ্টি সত্যিই স্থির রয়েছে তার দিকেই। লালের চিন্তাভাবনার স্রোতে বেঘাত ঘটিয়ে হলো আরো এক আশ্চর্য ঘটনা। মিষ্টি দ্রুত রাস্তা পেরিয়ে এসে দাঁড়ালো একেবারে লাল এর সামনে। ল্যাম্পপোস্টের উজ্জ্বল আলোয় যেন আরো বেশি মোহময়ী লাগছে তাকে। কিন্তু সেসব নাহয় পরে ভাবা যাবে, এখন লাল কিছু বলবে কি না বুঝতে না পরে দ্রুত নিজের মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলো।
'মুখটা ঘুরিয়ে নিলি যে ?', ভেসে এলো সেই পরিচিত, কোমল কণ্ঠ্যস্বর। লাল লক্ষ্য করলো যে তার গলার স্বরে কোনো রাগ বা বিরক্তি নেই, আছে শুধুই কোমলতা।
লাল কিছু বলে ওঠবার আগেই আবার কথা সোনা গেলো, 'বলি রোজ রোজ এখানে দাঁড়িয়ে থেকে অমন করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকিস কেন? লজ্জা করে না?' যদিও এটা নিতান্ত মজা করার ছলেই বলেছিলো মিষ্টি কিন্তু নিজের এই ছেলেমানুষি তে অত্যন্ত লজ্জা বোধ করছিলো তালাল । সত্যিই তো, মিষ্টি ভদ্র বাড়ির মেয়ে। তার পক্ষে এইরকম আচরণ অস্বস্তিকর মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। মাথা নিচু করে, মৃদু কণ্ঠে কিছু বলতেই যাচ্ছিলো লাল কিন্তু তাকে কোনোরকম বলার সুযোগ না দিয়েই হেসে ফেললো মিষ্টি। সেই হাসিতে কোনো তাচ্ছিল্য নেই, আছে একটু দয়া আর কৌতূহল মাত্র। 'আরে আমি তোর সাথে একটু মজা করছিলাম। তুই আমাদের স্কুলের সেই কৌস্তব না ?' পাঠকদের জানিয়ে দি, আমাদের এই লালের ভালো নাম কৌস্তব রায়, ভালোবেসে আর উচ্চারণের সুবিধার্থে লোকে তাকে লাল বলেই ডাকে।
'হ্যা, আমিই কৌস্তব। তুই আমাকে চিনিস ?', কিছুটা বিস্ময়ের সাথেই বলে উঠলো লাল। এরকম অদ্ভুত প্রশ্নে আবার হেসে ফেললো মিষ্টি , হাস্তে হাস্তে বললো 'ওমা চিনবো না কেন?আমরা একই ক্লাসে পড়তাম, তুই সেই লাস্ট বেঞ্চে বসতিস ?'
এতদিন লাল ভাবতো মিষ্টি বুঝি তাকে কোনোদিন নোটিশ ই করেনি। সেটাই তার কাছে খুব স্বাভাবিক বলে মনে হত। তার এই ভুল ধারণা ভাঙ্গায় সে যেন একটু আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলো।
'হ্যা, আমিই সেই। ' এই সংক্ষিপ্ত উত্তরেই থেমে গেলো লাল। আর কি বলবে ভেবে না পেয়ে জিজ্ঞাসু মুখে তাকিয়ে থাকলো মিষ্টির মুখের দিকে। লালের মনের ভাব আন্দাজ করে নিজেই বলে উঠলো , 'আইসক্রিম খাবি? এখানেই কাছেই দোকান আছে। ম্যাংগো ফ্লেভারের একটা নতুন আইসক্রিম বেরিয়েছে, খুব দারুন খেতে। '
এসব কি হচ্ছে আজ লালের জীবনে? যে মেয়েটির সাথে সে দুদণ্ড কথা বলার সাহস জোগাতে পারেনি এতদিনে, যাকে ল্যাম্পপোস্টের আড়ালে উঁকি মেরে দেখতো, সেই মেয়েটা নাকি আজ তাকে আইসক্রিম খাবার কথা প্রস্তাব করছে। ঘটনাটি সত্যি নাকি স্বপ্ন, ভাবার সময় নেই, এইরম সুযোগ সে কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে পারে না।
কোনোরকম বিলম্ব না করে মনে মনে 'শুভস্য শীঘ্রম!' বলে ছোট্ট বাচ্চাদের মতো ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো লাল।
মিষ্টির বিষয়ে আমাদের কিছু তথ্য জানা আবশ্যক। মিষ্টি মেয়েটি খুব মেধাবী এবং অমিশুকে গোছের হলেও লালের প্রতি তার একটা দুর্বলতা অনেকদিন থেকেই ছিল। লালের রোজ স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে তার অপেক্ষা করাটা তার নজর এড়ায়নি। প্রথম প্রথম খুব বিরক্তি লাগতো মিষ্টির, মনে হত ছেলেটি নিতান্তই অসভ্য গোছের যে শুধু মেয়েদের দিকে কুনজর দিয়ে বেড়ায়। কিন্তু যতদিন কাটতে লাগলো,ততই সে বুঝতে পারলো যে ছেলেটা হয়তো অতটাও খারাপ না কারণ লালের চোখে সে কোনোদিন কোনো লালসা দেখতে পায়নি , বরং দেখেছে নিষ্পাপ স্নেহ ও ভালোবাসা। নিজের অজান্তেই মানুষটাকে ভালো লাগতে থাকে মিষ্টির, তাই আজ আর বিলম্ব না করে ঠিক করে যে সে লালের সাথে কথা বলবে।
আইসক্রিম খেতে খেতে চলতে থাকলো দুজনের বার্তালাপ। প্রথম দিকে দুজনেই একটু ইতস্ত করছিলো কিন্তু আস্তে আস্তে কথার বেগ বাড়তে থাকলো। কিছুক্ষনের মধ্যেই যেন গভীর এক বন্ধুত্বের সূচনা হয়ে গেলো দুজনের মধ্যে, যেন কত দিনের পরিচিতি, কত যুগের আলাপ।
খাওয়া শেষ হলে মিষ্টি বললো, 'আজ তাহলে আসি? আবার পরেরদিন দেখা হবে। আসবি কিন্তু এখানে, যেমন প্রত্যেক বুধ আর রবিবার আসিস। ' শেষের কথাটা একটু আসতেই বললো মিষ্টি, লজ্জার ভাব তার মুখে স্পষ্ট। কথাটা কান এড়ায়নি লালের। সেও সলজ্জে নিজের মৃদু ভারী গলায় বলে উঠলো, 'আসবো। ' এই একটা কথাতেই যেন বড্ডো মায়া মাখানো ছিল, মনের গভীর অন্তরাল থেকে উঠে আসা এই একটা শব্দই যথেষ্ট ছিল তার মনের ভাব ব্যাক্ত করার জন্যে। দুজনেই আর কোনো বাক্যব্যয় না করে নিজের নিজের বাড়ির দিকে চলে গেলো। যাওয়ার সময় দুজনেই একবার করে ফিরে তাকালো অন্যজনের দিকে, তারপর বুক ভরা তৃপ্তি আর আশা নিয়ে এগিয়ে চললো নিজ নিজ গন্তব্যে।
পর্ব: ২
আজ শনিবার, লালের আজ ছুটি। তার বাবা কলকাতায় গেছেন এক জরুরি কাজে তাই দুদিন দোকান বন্ধ থাকবে, কাজেই আর দোকানে যেতে হবে না লালকে। এইধরণের ছুটির প্রাপ্তি প্রায় প্রতি মাসেই একবার না একবার ঘটে থাকে লালের। পড়াশোনার পথ অনেকদিন হলো চুকে গেছে তাই ছুটি পেলেই কেমন যেন কিংকর্ত্তব্যবিমূড় হয়ে পরে সে।
সকালবেলা চা খেতে খেতে হঠাৎ বিজয়ের কথা মনে পরে তার , অনেকদিন তার সাথে কথা বলা হয়না। 'নাহ , আজ একবার দেখা না করলেই নয়। ছেলেটার সাথে দেখা হয়না অনেকদিন। একবার কল টা করেই ফেলি। '
যেমনি ভাবনা তেমনি কাজ, একটানে কাপের অবশিষ্ট চা-টুকু শেষ করে ফোন টা পকেট থেকে বের করলো লাল। কল লাগালো নিজের প্রাণের বন্ধু বিজয়কে।
বিজয় ছিল লালের সমগ্র স্কুল লাইফের সম্ভবত একমাত্র ব্যেক্তি যাকে সে বন্ধু বলে সম্বোধন করতো। সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে, সবসময়ই লাল পাশে পেয়েছে বিজয়কে। লাল ছোটবেলা থেকেই অতীব স্বল্পভাষী, কাজেই বন্ধুও জোটেনি খুবএকটা। কিন্তু বিজয় ছিল ঠিক ওর উল্টো, একবার কথা বলা শুরু করলে তাকে থামায় কারোর সাধ্য নেই। মানুষ হিসেবেও খুবই ভালো। যেসব পরিস্থিতিতে অন্যরা পিছিয়ে আসত, সেইসব বিপদের দিনেও হাত ছাড়েনি সে লালের। মুখচোরা, নিরীহ গোছের এই বন্ধুটির ওপর খুব মায়া হত বিজয়ের, নিজের ভাইয়ের মতো আগলে রাখতো সে লালকে। স্কুল শেষ হওয়ার পর খুব একটা আর দেখা হয়না দুই বন্ধুর, তাই আজ সেই সাধ মেটাতে ফোন করলো সে বিজয়কে।
'হ্যালো, বল ভাই কি খবর?', ওপার থেকে ভেসে এলো ঘুমজড়ানো এক কন্ঠ্যস্বর।
'আর খবর! বলি মনে আছে আমাকে নাকি এখন কলেজে নতুন বন্ধু পেয়ে ভুলেই গেছিস?', কিছুটা অভিমান মিশ্রিত স্বরেই বললো লাল।
'ধুর পাগলা! তোকে ভুলতে যাবো কোন দুঃখে? তোর চীনাবাদামের মতো মুখ কি কেউ ভুলতে পারে ?', বলেই হাসতে থাকে বিজয়। লাল-ও হেসে ফেললো বন্ধুর এই অমানবিক ব্যাখ্যায়। কতদিন এইভাবে হাসেনি দুই ভাই!
'ঐসব ফালতু কথা রাখ। আজকে সারাদিন ফ্রি আছি। দেখা করবি? তোকে একটা খবর দেওয়ার আছে। '
'কি খবর?'
'আরে তুই আগে দেখা তো কর তারপর সব বলছি। এদিকে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। বিকেলে পাঁচটা নাগাদ পৌঁছে যাস খেলার মাঠে। ', বলেই ফোনটা কেটে দিলো লাল।
খানিকটা অবাক-ই হলো বিজয়। এর আগে কোনোদিন কোনো বিশেষ খবর দেওয়ার তাগিদে কল করেনি লাল। কিন্তু সকাল সকাল এতো মাথা ঘামাতে নারাজ বিজয়, ফোনটা সাইড এ রেখে আবার ঢোলে পড়লো গভীর নিদ্রায়।
বাকি গোটা দিনটা কাটলো মিষ্টির সাথে কাটানো সেই বিকেলের স্মৃতিতে। অতি বিচিত্র ভঙ্গিতে বিছানায় রীতিমতো গড়াগড়ি খেতে খেতে আপন মনেই কিসব বকতে থাকলো লাল। এমনই তার অবস্থা যে বাইরের কেউ যদি ঘরে ঢোকে তাহলে তার আর বিস্ময়ের সীমা থাকবে না। মেয়েটির কথা ভাবতে ভাবতে আচমকা সে ধড়মড় করে উঠে বসলো বিছানায়, যেন কোনো অনর্থ হয়ে গেছে। অনর্থ একরকম হয়েছে তা অস্বীকার করার জো নেই। যার সাথে কথা বলার স্বপ্ন সে বিগত তিন বছর ধরে দেখেছে, যার সাথে দৈবী-শক্তির কৃপায় তার কথাও হয়েছে, সেই মানুষটার ফোন নাম্বারটা নেওয়া হলো না?! নিজের নির্বুদ্ধিতায় কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে গেলো সে ঘর থেকে। এখন একটা সিগারেট না খেলেই নয়।
লালের প্রস্তাবকে উচিত মর্যাদা দিতে পাঁচটার কিছু আগেই মাঠে এসে হাজির হয়েছে বিজয়। সেই ছোটবেলার খেলার মাঠ। কতই না খেলেছে এই মাঠে দুই বন্ধু মিলে। লাল এখনো মাঝেমাঝেই ঘুরে বেড়ায় মাঠটায় কিন্তু বিজয়ের সেই বিলাসিতা আর নেই। স্কুল শেষ হওয়ার পর দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সাইন্স নিয়ে ভর্তি হয় বিজয়, ছেড়ে চলে যেতে হয় ছোটবেলার চিরপরিচিত নিজের শহরকে। এখন কলেজ কিছুদিন ছুটি তাই এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সে চলে এসেছে নিজের বাড়িতে। এইসবই ভাবছিলো বিজয় এমন সময় কানে গেলো সেই পরিচিত ভারী অথচ তীক্ষ্ণ আওয়াজ, 'আমার আগেই চলে এসেছিস দেখছি। আর বল কেমন চলছে সবকিছু ?'
বন্ধুকে এতদিন পর দেখতেই মুখে হাসি ফুটে উঠলো বিজয়ের, প্রত্যুত্তরে সে বলল, 'সব ভালোই চলছে আপাতত। শুধু নিজের ঘরটাকে, বাবা-মা কে, বন্ধুদের, বড্ডো মিস করি। '
'হুম ' বলে সম্মতিসূচকভাবে ঘাড় নেড়ে সোজা গিয়ে বসলো সিমেন্টের তৈরী পুরোনো বেঞ্চটায়। বন্ধুকে অনুসরণ করে বিজয় গিয়ে বসলো ঠিক তার পাশে।
'এবার বল। কি এমন খবর তোর ঝুলিতে আছে যা জানানোর জন্যে আমাকে সকাল সকাল যোগনিদ্রা থেকে জাগানোর প্রয়োজন হল?'
'মিষ্টির কথা মনে আছে ?', খানিকটা উত্তেজিত হয়েই বলে উঠলো লাল। আনন্দের ভাব তার চোখে মুখে স্পষ্ট।
কিন্তু বিজয় যেন উত্তেজনার মাত্রা আরো কিছুটা বাড়িয়ে দিয়ে, চোখগুলো বড়ো বড়ো করে জিজ্ঞেস করলো, 'কে? প্রিয়া? আমাদের ক্লাসের সেই প্রিয়া দাস? যার কথা বলার সময় তোর বুলি ফুরোতো না সেই প্রিয়া?'
'হ্যা, এ সেই মেয়েরই কথা বলছি। গত বুধবার কথা হয়েছে ওর সঙ্গে, দুজনে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খেয়েছি। ' এই কথা শুনে বিজয়ের বিস্ময়ের আর অন্ত রইলো না, সে যেন একেবারে আকাশ থেকে পড়লো। লালের জীবনের এমন কোনো গল্প নেই যা সে তার এই বন্ধুর সাথে শেয়ার করেনি, তাই বলা বাহুল্য যে মিষ্টির বিষয়ে খুব ভালো মতোই অবগত ছিল বিজয়। তাই গল্পের এই আশাতীত অগ্রগমনে তার মনে জেগে উঠলো অদম্য কৌতূহল। সেই কৌতূহল এবং প্রশ্ন সমষ্টি ঠিকভাবে ব্যাক্ত না করতে পেরে সে বলে উঠলো, 'মানে? কিভাবে? কে কথা বলল- তুই নাকি প্রিয়া? তারপর আর কথা হয়েছে? এসব কিকরে হল?'
বিজয়ের প্রশ্নের ধরণ দেখে কিছুটা হকচকিয়ে গেলো লাল। মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে সে বলল, 'ধুর বাবা! একটু থেমে থেমে জিজ্ঞেস কর। এতো ব্যস্ত হচ্ছিস কেন? সব বলছি, আগে তুই একটু শান্ত হয়ে বস।' কথাটা বলেই উঠে দাঁড়ালো লাল। 'তুই একটু বোস, আমি দোকান থেকে দুটো কোল্ড-ড্রিঙ্ক নিয়ে আসি। ' বন্ধুকে হতবাক অবস্থায় রেখে সে এগিয়ে চললো দোকানের দিকে।
লালের ফিরে আসতে মোটামোটি পাঁচ/সাত মিনিট সময় লাগলো। ততক্ষনে নিজেকে বেশ কিছুটা সামলে নিয়েছে বিজয়। মনে মনে বেশ আমোদ পেয়েছিলো বন্ধুর এই নতুন অধ্যায়ের কথা শুনে।
লালের হাত থেকে বোতলটা নিয়ে তার ঢাকনা খুলতে খুলতে বলল, 'নে, এবার বলা শুরু কর। অনেক্ষন
নিরর্থক অপেক্ষা করিয়েছিস। ' কোল্ডড্রিঙ্কের বোতলে চুমুক দিয়ে লাল শুরু করলো তার কাহিনী। যতই গল্প এগোতে লাগলো ততই বিস্ময় আর আনন্দের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠলো বিজয়ের মুখে। গোটা পৃথিবীতে একমাত্র এই মানুষটাই জানতো যে লাল ঠিক কতখানি ভালোবাসে মিষ্টিকে। এই ভালোবাসা নিছক রূপের আঁধারে গড়ে ওঠা বাচ্চাদের রূপকথার ভালোলাগার মতো নয়। লাল ভালোবেসেছিলো মানুষটাকে, তার রূপকে নয়। এই ভালোবাসার কারণ জানতে হলে জানতে হয় মিষ্টির জীবনের কাহিনী।
প্রিয়া (মিষ্টি) ছোটবেলার থেকেই তার দাদু-ঠাকুমার কাছে মানুষ হয়েছে। মিষ্টির যখন মাত্র ছয় বছর বয়েস, তখন সে তার বাবা মা, দুজনকেই হারায় এক বাস একসিডেন্টে। সালটা ছিল ২০১১, মধ্যমগ্রাম চৌমাথায় L -২৩৮ বাসের সাথে সজোরে ধাক্কা লাগে একটি লরির। মৃতের সংখ্যা ছিল সাত এবং ১৫ জন গুরুতর আহত। সেই মৃতদের তালিকায় ছিল মিষ্টির মা-বাবাও। ছয় বছরের বাবামা-হারা সেই শিশুর মনে কি নিদারুন বেদনার ছাপ ফেলেছিলো তা কেবল হয়তো ভগবানই জানেন। বহু বছর ধরে চলেছিল মানসিক চিকিৎসা। ছোটবেলার সেই ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে পারলেও আজও
ভুলতে পারেনি সে কিছুই। আজও হয়তো অতীতের কথা মনে করে তার দুগাল বেয়ে নেমে আসে অশ্রুধারা, যা সে সবার অলক্ষেই মুছে ফেলে তার সেই ছোট্ট রুমালটায়।
বয়েস বৃদ্ধির সাথে সাথে নিজেকে অনেকটাই গুছিয়ে নিয়েছে মিষ্টি। অতি অল্প বয়েস থেকেই দাদু ঠাম্মার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়ার জন্যে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্যে চলেছে দীর্ঘ লড়াই আর অক্লান্ত পরিশ্রম। কোনোদিন কারোর সহানুভূতির অপেক্ষায় বসে কাঁদেনি মেয়েটি, বরং দৃঢ় সংকল্প নিয়ে সর্বদাই এগিয়ে গেছে নিজের লক্ষ্যের দিকে। মিষ্টির স্বপ্ন সে ভবিষ্যতে কেমিস্ট্রির প্রফেসর হবে। তার আরো একটা স্বপ্ন আছে, গরিব, অনাথ বাচ্চাদের বিনামূল্যে শিক্ষা প্রাপ্তির সুযোগ করে দেওয়া। মিষ্টির জীবনের এই করুন কাহিনী ও সেই কঠিন পরিস্থিতির সাথে মোকাবিলা করার ব্যক্তিত্বই হয়তো মুগ্ধ করেছিল লালকে।
যেদিন সে নিজের সহপাঠীদের কাছ থেকে মিষ্টির জীবন সংগ্রামের কথা জানতে পারে, সেদিন থেকেই যেন ধীরে ধীরে ভালোবেসে ফেলে তাকে। যা সবার নজর এড়িয়ে যায় তা লালের নজর এড়াতে পারেনি কোনোদিন, আর সেটা হল মিষ্টির গাল-ভরা হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকা চাপা কষ্ট। সেই কষ্ট স্পষ্ট অনুভব করতো লাল। সবার অজান্তেই সে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করে যেত, করতো কেবলই তার মঙ্গল কামনা।
কথা বলতে বলতে সন্ধ্যে হয়ে এসেছে, মাঠে খেলায় রত ছেলেরাও এবার যে যার বাড়ির দিকে রওনা হচ্ছে। লালের গল্পও শেষ হয়েছে এতক্ষনে। বিজয় ডুবতে থাকা সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আজ তবে উঠি? অনেক দেরি হয়ে গেছে। আজকে আবার মা-কে নিয়ে একটু বাজারে যেতে হবে। ' কিছুটা থেমে সে আবার বলল, 'এরপর কবে দেখা হচ্ছে?'
'কালকেই আবার বেরোলে হয়। মৌচাক এ যাবি পাপড়ি চাট খেতে?', অত্যন্ত সরল ভাবেই বলল লাল। লালের সরলতায় আবারো হাসতে হাসতে বিজয় কিছুটা তিরস্কারের ভঙ্গিতে বলল, 'ওরে গাধা আমি আমাদের দুজনের কথা বলছি না। তোদের দুজনের কথা বলছি!' স্মিত হেসে, স্বলজ্জে লাল উত্তর দিল, 'কাল। ' মৃদু হেসে বন্ধুকে বেস্ট অফ লাক জানিয়ে, প্যান্ট থেকে ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালো বিজয়।

No comments:
Post a Comment