পর্ব:
৫
আজ
প্রায় ছয় মাস হয়ে গেছে। এর মধ্যে লালের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ আর অনলাইন টেক্সট এবং
ভিডিওকলে কথা বলাটা খুবই স্বাভাবিক দৈনিন্দিন ক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। দুজনের মধ্যে
কেউই এখনো প্রপোস করেনি ঠিকই, কিন্তু
নিজেদের ব্যাবহারে আর কথার মিষ্টতায় প্রেমের ভাব অতি স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে।
মাসটা
এখন অক্টোবর, শরৎকাল। শরৎকাল বাঙালিদের কাছে খুবই
বিশেষ এক ঋতু। ঘাসের সবুজে সাদা মুকুটের মতো কাশফুল বয়ে আনে মায়ের আগমনী বার্তা।
গোটা বিশ্বের লোক বাঙালিদের নামের সাথে জুড়ে দেয় বাংলার বিখ্যাত 'রসোগোল্লা' আর উৎসবের মধ্যে সবার সেরা 'দুর্গোৎসব'।
আজ
মহালয়া, দেবীপক্ষের সূচনায় আর মাত্র একদিনের
অপেক্ষা। মহালয়ার দিন আজকালকার ছেলে মেয়েরা টিভিতে মহালয়া দেখতেই বেশি পছন্দ করে
অথবা আমাদের লাল কুমারের মতো ঘুমিয়ে কাটানোয় ব্যায় করে, তবে আমাদের মিষ্টির পছন্দ একটু অন্য
ধরণের। প্রত্যেক বছর তার এই শুভ দিনটি শুরু হয় বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র -র কণ্ঠে
মহালয়া পাঠ শুনে। এ বছরও এই সুপ্রাচীন নিয়মের ব্যাতিক্রম দেখা গেলো না। ভোর সাড়ে
চারটে বাজতেই চালানো হল মহালয়া।
বাইরে
প্রায় অন্ধকার, সূর্য সবে একটু উঁকি মারছে নীল আকাশের
ওই তুলোর মতো সাদা মেঘের আড়ালে। মিষ্টি বরাবরই একটু ঠাকুর ভক্ত। বীরেন্দ্র কৃষ্ণের
বজ্র কণ্ঠে মায়ের স্তুতি শুনতে শুনতে কখন যে চোখের কোণে জল জমেছে তা বুঝতে পারেনি।
নিজের ঘরের জানালা থেকে বাইরে তাকিয়ে হাত জোর করে কি যেন প্রার্থনা করছে সে।
সূর্যের সোনালী আভায় তার মুখে ফুটে উঠেছে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা, কোমল হৃদয়ের অধিকারীনি এই মেয়েটির
প্রার্থনা বুঝি মা শুনেছেন।
সময়-
সকাল আটটা। সকাল সকাল স্নান, পুজো, ইত্যাদি সকল কাজ সেরে নিজের পকেট
ডায়েরি খুলে আর হাতে মোবাইলে ক্যালেন্ডার খুলে, খুব
মনোযোগ সহকারে, পুজোয় কবে এবং কোথায় ঘুরতে যাওয়া হবে
সেই প্ল্যানের একটা হেস্তনেস্ত করার সংকল্প নিয়ে খাটের উপর বুদ্ধ মূর্তি ধারণ করে
বসেছে মিষ্টি। তৃতীয়ায় আর অষ্টমীর দিন লালের সাথে বেরোবে সে, আর বাকি কোন দিন বন্ধুবান্ধবের সাথে
বেরোবে সেইসব নিয়ে নিজের শান্ত মাথাকে ব্যাস্ত করে পেন ঘসেই চলেছে তার সেই জীর্ণ
ছোটো ডাইরিতে। এমনসব 'গুরুত্বপূর্ণ' কাজে যখন সে ভীষণ ব্যাস্ত, তখনি একটা কল এলো তার ফোনে। না, এই কল আমাদের লাল বাবুর একেবারেই না, সে তো এখন ঘুমে কাদা হয়ে মিষ্টির
স্বপ্ন দেখতেই ব্যাস্ত!
কলটা
শিউলির। শিউলি মিষ্টির সবথেকে কাছের বন্ধু। ছোটবেলা থেকে একই স্কুলে পড়ে বড়ো হয়েছে
দুই বন্ধু। এদের দুজনের বন্ধুত্ব অনেকটা
সেই লাল আর বিজয়ের মতোই। ছোটবেলার থেকেই মিষ্টির সুখ দুঃখ, সব ভাগ করে নিয়েছে শিউলি। তার মা বাবার
অভাব কেউ কোনোদিন পূরণ করতে পারেনি ঠিকই কিন্তু একটা বোনের মতো তার পাশে থেকে সেই
অভাব পূরণ করতে সক্ষম শিউলি। কল তুলে কিছু বলতে যাবে মিষ্টি তার আগেই ওপার থেকে
অনর্গল বোকা আরম্ভ করে দিল শিউলি। তার কথার বেগ বুঝি রাজধানী এক্সপ্রেসকেও হার
মানায়!
"কিরে মিঠু কি খবর তোর? বলি আমাকে তো প্রায় ভুলেই গেছিস। অবশ্য
ভুলবি নাই বা কেন, নতুন বয়ফ্রেন্ড জুটেছে বলে কথা! এখন আর
আমার কিসের প্রয়োজন। আমি তো এখন তোর জীবনে মমিফাইড ইতিহাসের চেয়েও পুরাতন, আমায় আর...."
-"তুই থামবি?! মানে সকাল সকাল এতো বকার এনার্জি পাস
কথা থেকে? মানে মানুষ অন্তত একটু নিঃশেষ নেওয়ার
জন্যেও তো থামে রে বাবা। "
-"হ্যা হ্যা, সে তো বটেই। আমার কথা তো এখন ভাট বোকা
মনে হবেই। হায় ভগবান! শেষমেশ তুইও ভুলিয়ে দিলি আমায়। এখন বুঝতে পারছি লোকজন কেন
বলে যে ভালোবাসা অন্ধ !!"
অন্য
কোনো বিষয়ে মিষ্টির মতো শান্ত মস্তিষ্কের মানুষকে উত্তক্ত করা বেজায় কঠিন হলেও
এইবার বিফল হয়নি শিউলি। কিছুটা বিরক্তির সুরেই মিষ্টি বলে উঠলো, "নে অনেক হয়েছে। আর না। সবসময় কিন্তু
এরম ফাজলামি আমার ভালো লাগে না শিউলি !"
-" আচ্ছা বাবা আর বলবো না। রাগ করিস না।
দেখা গেলো মহিষাসুর বধের আগে তুই-ই আমাকে বধ করে ফেলবি।"
শিউলির
এই শিশুসুলভ ব্যাজ্ঞপ্তিতে হেসে ফেললো মিষ্টি। হাসির চোটে তার রাগের প্রভাব যাতে
সম্পূর্ণ মুছে না যায় সেই জন্যে যথাসম্ভব হাসি সংবরণ করে কিছুটা গাম্ভীর্যের সাথে
বলল,
-"বল কি বলবি।"
-"কেন রে? সবসময় কিছু বলবো বলেই কল করতে হবে নাকি তোকে? একটু তো কথা বলতেও ইচ্ছে করে নাকি?"
-"আরে না না, আমি সেটা বলছি না..."
-"হয়েছে, হয়েছে। আর অত কৈফিয়ত দিতে হবে না! পুজোয় কবে কোথায় যাবি কিছু ঠিক
করলি?"
-"সেটাই করছিলাম রে পাগলী। কিন্তু আমি
আগে থেকেই বলে রাখি, আমি কিন্তু তৃতীয়া আর অষ্টমীর দিন
বেরোতে পারবো না। "
ওই
দুই দিন যে মিষ্টি কার সাথে বেরোবো তা কতটা আন্দাজ করতে পেরেছিলো শিউলি। কাজেই
বান্ধবীকে জ্বালাতন করার এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া না করে দ্রুত প্রশ্ন করলো-
"লালের সাথে বেরোবি, তাই না?"
ওপার
থেকে সলজ্জ উত্তর এলো,
"হ্যা। "
-"আমি না এখনো বুঝতে পারিনা, তুই কি এমন দেখলি ওই সজনে ডাঁটার মতো
ছেলেটার মধ্যে?"
-"এই শিউলি! এ আবার কি ধরণের কথা ?!"
-"আরে বাবা সিরিয়াসলি নিশ না। আমি একটু
মজা করছিলাম মাত্র। "
-"ওর মধ্যে যে কি দেখেছি তা শুধু আমিই
জানি। ছেলেটার মধ্যে কোনো জটিলতা নেই জানিস? আর
ভালোবাসা বস্তুটা রূপ দেখে হয়না, হয়
শুধু যত্ন আর সম্মানের থেকে।"
-"হুম, বুঝলাম। যাক বাবা, এতদিনে
কেউ তো এমন এলো যে তোকে মন থেকে ভালোবাসে।", একটা ছোটো দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলল, "আমার পোড়া কপালে আর কেউ জুটলো না! শুধু এই মশাগুলোই আমাকে অকাতরে
ভালোবেসে সযত্নে চুমু খেয়ে গেলো!"
শিউলির
শেষ উক্তিটি শুনে মিষ্টি আর হাসি রোধ করতে পারলো না। দুজনেই কমপক্ষে দুই মিনিট ধরে
পাগলের মতো হেসে গেল।
-"কোথায় যাবো এখনো পুরোপুরি কিছু ঠিক
করিনি, তবে অত্যাধিক ভিড় ঠেলে ঠাকুর দেখার
ইচ্ছে আমার খুবএকটা নেই। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবো। আর ভাবছি অষ্টমীর
দিন ওর সাথে একটু কফি হাউস এ যাবো। "
-"ধ্যাৎ! আজকাল আবার কে কফি হাউসে যায় রে? ওরে বোন, কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, আজ আর নেই। "
কিছুটা
হেসে মিষ্টি উত্তর দিল,
"তা অবশ্য ঠিক
বলেছিস। কিন্তু জানিনা কেন জায়গাটা আমার বেশ ভালোই লাগে। দেখি কোথায় যাওয়া যায়।
আমি তো আবার কলকাতার রাস্তাঘাট তেমন একটা চিনি না। "
-"দেখ কোথায় যাবি। তবে তার থেকে বেশি
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল যে কি করবি ওই দুদিন?"
-"বড্ডো বেশি আগ্রহ দেখছি তোমার? সেসব কেন জানাবো তোকে?"
-"সেই, সেই, আমাকে আর কেন জানাবি? আমি তো আর তোর কেউ নোই। "
-"তুই আবার শুরু করলি?.... আচ্ছা শোন্, আবার পরে কথা হবে। ওদিকে ঠাম্মি ডাকছে।
দেখি কি হল। আর শোন্, বলছি যে তুই, আমি আর শিবু নাহয় ষষ্ঠীর দিন যাবো
উত্তর কলকাতায় ঠাকুর দেখতে। ওকে বলে দিস ফোন করে। "
-"ওকে, টাটা। তাহলে দেখা হচ্ছে ষষ্ঠীর দিন। "
এদিকে
মিষ্টির ঠাকুমা তাকে ডেকেই যাচ্ছে , "দিদিভাই, ও দিদিভাই! একটু এদিকে আয় না মা। আমার
চশমাটা খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও। এর মধ্যে কোন ওষুধটা..."
"হ্যা ঠাম্মি, আসছি!", বলে ফোনটা রেখে দ্রুত পায়ে মিষ্টি
ছুটলো দাদু-ঠাম্মার ঘরের দিকে।
ঘরে
প্রবেশ করেই জিজ্ঞাসু সুরে তাকে আহ্বানের হেতু জিজ্ঞেস করায় তার ঠাকুমা গোটা
ওষুধের বাক্সটা নাতনির সামনে ধরে বললেন, "দেখ তো দিদিভাই এর মধ্যে কোন ওষুধটা সেই সকালে খালি পেটে খেতে হবে?"
দাদু-ঠাম্মার
এখন যথেষ্ট বয়েস হয়েছে, কাজেই একেবারে মায়ের মতো করে যত্ন করে
সে তার আদরের দাদু-ঠাম্মিকে। ওষুধের বাক্স হাতড়ে মুহূর্তের মধ্যে একটা পাতা তুলে, ট্যাবলেট বের করে এগিয়ে দিল ঠাম্মির
দিকে। ধীরে ধীরে জলের গ্লাসটা নিয়ে ট্যাবলেটের সদ্গতি করে প্রশ্ন করলেন তাঁর আদরের
নাতনিকে- "কি করছিলি রে দিদিভাই? কে
ফোন করলো?"
মিষ্টি
আদুরে গলায় জবাব দিল,
"ওই শিউলি ফোন
করেছিল। পুজোয় কোথায়, কবে, যাওয়া হবে সেইসব নিয়ে কথা হচ্ছিলো। "
-"বাহ্, ভালো ভালো। তবে রাত জেগে ঠাকুর দেখতে যেন যাস না আবার। তোর দাদান
কিন্তু খুব রাগ করবে। "
-"না না, রাত জেগে ঠাকুর দেখার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। প্রত্যেক বছর যেমন যাই, তেমনি যাবো। আচ্ছা দাদান কোথায় গো
ঠাম্মি? সকাল থেকে দেখছি না তো। বাজারে গেছে ?"
-"হ্যা, আজকে মহালয়া বলে কথা! তাই সকাল সকাল বেরিয়ে গেছে বাজার করতে। আজ তোর
জন্য একটু খাসির মাংস আনতে বললাম। অনেকদিন হল বাড়িতে খাসি আনা হয়নি। "
মিষ্টির
দাদুর নাম শ্যামাচরণ দাস,
পেশায় ছিলেন শিক্ষক। প্রায় ৮০-র ওপর
বয়েস হবে ভদ্রলোকের, কিন্তু এখনো তার চেহারা বলিষ্ঠ, নীরোগ দেহ, এবং তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কের অধিকারী।
মহালয়ার দিনটা তার কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ, মায়ের
আগমন বলে কথা ! বহু বছর ধরে ফিজিক্সের শিক্ষকতা করলেও ঈশ্বরের প্রতি তার বিশ্বাস
অবাক করার মতো। গলায় তার ১০৮ টা বীজের পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে লাল চন্দনের তিলক কাটা, বেশভূষা অতি সাধারণ - সাদা ধুতি আর
হালকা রঙের কুর্তা/পাঞ্জাবি, দেখে
মনেহয় কোনো মন্দিরের তন্ত্র সাধক।
ঠাম্মির
কাছে আদর আহ্ললাদ পেলেও দাদুর কাছে সেটা খুব একটা জোটেনি মিষ্টির। নাতনিকে অত্যন্ত
স্নেহ করলেও কোনোদিন শাসনের অভাব রাখেননি শ্যামাচরণ বাবু। কাজেই বলা বাহুল্য যে ভয়
যদি মিষ্টি কাউকে করে থাকে তাহলে সেটা তার দাদুকে। দাদুর কড়া শাসনের মধ্যে বড়ো
হলেও দাদানের প্রতি ভালোবাসার কোনো খামতি ছিল না মিষ্টির।
"উফফ! কতবার বলেছি দাদান-কে যে এই বয়েসে
একা একা এতো বাজার না করতে। বলি আমাকে নিয়ে গেলে কি অসুবিধা হত শুনি?"
-"সে কি আর হয় রে মা? তোর দাদানকে তো চিনিস। বয়স হলে কি হবে? বয়েস যে হয়েছে সেটা মানলে তবে তো! এখনো
সব কাজে 'আমি একাই একশো' ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। "
-"তা যা বলেছো ঠাম্মি !"
এরপর
মিষ্টি আবার ফিরে যায় তার ঘরে। ঘরে ঢুকেই ফোন খুলে হোয়াটস্যাপ চেক করে সে। নাহ, কোনো মেসেজ আসেনি 'তার' তরফ থেকে। তাহলে কি এখনো ঘুমাচ্ছে?! ছেলেটা পারেও বটে ! কি করবে ভেবে না পেয়ে নিজেই টেক্সট করল লালকে, "গুড মর্নিং। মানে আজকে তো অন্তত একটু
সকাল সকাল উঠতে পারতিস! কত ঘুম লাগে তোর?"
ওপার
থেকে কোনো জবাব আসলো না দেখে ফোনটা বিছানায় নিক্ষেপ করে, নুপুরের ঝুম ঝুম শব্দ করে মিষ্টি চলে
গেল সংসারের কাজে ঠাম্মিকে সাহায্য করতে। মনে মনে ভাবলো, "ঘুমোক শয়তানটা! সারাদিন শুধু ঘুমিয়েই
যাচ্ছে ! একবার শুধু কল করুক, তারপর
ওর হচ্ছে!!"
পর্ব:
৬
"ওই বাঁদর! আর কত ঘুম লাগে তোর? এদিকে বেলা কত হয়েছে তা খেয়াল আছে?.... অন্তত আজকের দিনটা তো একটু সকাল সকাল
উঠতে হয়!", রুমা দেবীর তীক্ষ্ণ তিরস্কারে গোটা ঘর
যেন কেঁপে উঠলো। গভীর নিদ্রায় শায়িত লাল এবার ভীষণভাবে অপ্রস্তুত অবস্থায় উঠে বসলো
বিছানায়। ছেলের উত্তর না পেয়ে আরো একবার অন্তিম সতর্কবার্তা ঘোষণা করে রুমা দেবী
বললেন, "তুই কি উঠলি নাকি যেতে হবে আমাকে? আর যদি একবার ডাকতে হয় খুব খারাপ হয়ে
যাবে কিন্তু বাবু!!..... ওই শয়তান!" নিজের জীবনের চেয়েও প্রিয় ঘুমে ব্যাঘাত
পেয়ে অতীব বিরক্তির সাথে লাল নিজের কণ্ঠ্যস্বর দুই ঘর বাড়িয়ে উত্তর দিলো, "উঠেছি!!"
মিষ্টির
বিপরীত, লালের কাছে মহালয়ার কোনো বিশেষ
প্রাধান্য নেই, কাজেই এমন ঘুমিয়ে দিন কাটিয়ে দেওয়ার
সুযোগ মোটেও হাতছাড়া করতে চায়নি সে। কিন্তু মায়ের ডাক অমান্য করার সাহস লালের নেই, অগত্যা শয্যা ত্যাগ করাটাই শ্রেয়।
বর্তমান
প্রজন্মের আর পাঁচটা ছেলে মেয়ের মতো লালও ঘুম থেকে উঠে নিজের ফোনকে অবহেলা করে উঠে
যেতে অসক্ষম। তাই প্রতিদিনের অভ্যাস মতো আজও সবার আগে ফোনের দিকেই নজর গেল। ঘুমন্ত
চোখগুলো ডলতে ডলতে যেই স্ক্রিন অন করলো, তার
ওপর ভেসে ওঠা নোটিফিকেশন দেখে মুহূর্তের মধ্যেই সমস্ত ঘুম যেন বাস্প হয়ে মিলিয়ে
গেল। মিষ্টির টেক্সট !
প্রেমিকার
টেক্সট পড়ে দিনের শুভারম্ভ করতে চায়না এমন প্রেমিকের অস্তিত্ব আছে কি না বলা ভার।
দুরন্ত গতিতে হোয়াটস্যাপ খুলে টেক্সট পড়তে আরম্ভ করলো লাল। মুখে যেন তার হাসি আর
ধরে না!
কিন্তু
একী? যে ধরণের টেক্সট সে আশা করেছিল এ যে
তার ঠিক বিপরীত! ঠিক যে গতিতে তার মুখ হাসিতে ফুটে উঠেছিল বোধ করি তার চেয়েও
দ্বিগুন গতিতে তা পরিণত হল ভয় আর বিস্ময়ের মিশ্রিত অভিব্যক্তিতে।
মেয়েটা
রেগে গেছে। প্রেম করার এই এক ঝামেলা। মানব জাতির এই হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে
অনেক রহস্যের সন্ধান এবং সমাধান মিললেও নারী জাতির মনের রহস্যের উদ্ঘাটন করতে
ব্যার্থ পুরুষ সমাজ। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে মানুষের আশা আকাঙ্খার কোনো শেষ নেই, কিন্তু সেসব থেকে আলাদা আমাদের লাল
শুধু একটু ঘুমোতেই তো চেয়েছে! না সে চায় রত্নভাণ্ডার না অন্য কোনো লোভনীয় সুখ, তার পক্ষে নিদ্রাই পর্যাপ্ত। কিন্তু এই
সামান্য চাহিদাটাই যেন সমাজ মেনে নিতে চাইছে না, তা সে মা হোক অথবা মিষ্টি।
প্রণয়িনীর
রাগ ভাঙানোর অভিযানে এখন প্রথম পদক্ষেপ কি হওয়া উচিত তা নিয়ে বিচার করার সময় নেই।
এক্ষুনি একবার স্বশরীরে মা-কে দর্শন না দিলে যে বাড়িতেও একটা কুরুক্ষেত্র বাধবে
তাতে কোনো সন্দেহ নেই!
সিঁড়ি
দিয়ে নামার সময় জননীর সাথে চোখাচোখি হতেই রুমা দেবী আরো একবার গর্জে উঠলেন-
"এতক্ষনে ঘুম হল?!",
পাশের ঘরের দিকে তাকিয়ে এবার কাকে যেনো
উদ্দেশ্য করে বললেন,
"আর ওই আরেকজন
এখনো কি সুন্দর নির্লজ্জের মতো শুয়ে আছে!" স্ত্রী-এর কোথায় এবার বুঝি একটু
টনক নড়লো শ্যামল বাবুর। যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি বিছানা ত্যাগ করে নিজের সেকেলে যুগের
গোল, কালো ফ্রেমের চশমাটা পরিধান করে, নিজের প্রকান্ড ভুঁড়ির উপর হাত বোলাতে
বোলাতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি।
স্বামী-পুত্রের
প্রতি আবারো একটি কটাক্ষ ছুড়ে বললেন- "যেমন বাবা তার তেমনি ছেলে! ভোর বেলা
উঠে সারাদিন শুধু সংসারের কাজ করে যাওয়াটা যেনো একমাত্র আমারই দায়িত্ব!... বলি বাপ্
বেটা মিলে অন্তত বাজারটা তো করে আনতে পারো নাকি !!?"
গিন্নির
হুঙ্কার থেকে মুক্তি পাওয়ার এখন একটাই উপায়- 'বাজার
অভিযান'। কাজেই আর বিলম্ব না করে বাজারের
ব্যাগ নিয়ে, ছেলেকে চোখের ইশারায় সঙ্গে আসতে
নির্দেশ করলেন। বাড়ির হাওয়া গরম, ঠান্ডা
হতে সময় লাগবে, কাজেই মায়ের বকুনি থেকে রেহাই পেতে লাল
কোনো প্রতিবাদ না করে চুপচাপ তার বাবাকে অনুসরণ করল।
শ্যামল
বাবু লোকটা ভীষণ সাদামাটা। ছোটবেলা কেটেছিল অভাব অনটনে, তাই অল্প বয়েস থেকেই কাঠের ব্যবসায় যোগ
দেন এবং কিছু কালের মধ্যেই বিপুল ধন-সমপত্তির অধিকারী হয়ে ওঠেন তিনি। টাকা পয়সার
কোনো অভাব না থাকলেও লোকটার মধ্যে কোনো সময় দাম্ভিকতা দেখা যায়নি। আজও তার পোশাক
পরিচ্ছদ অতি সাধারণ, দেখে কেউ বলতেই পারবেন না যে তিনি অত
ধনী ব্যেক্তি।
"এক্ষুনি
না বেরোলে বোধহয় তোর মা মেরেই ফেলতো আমায় !" কথাটা বলেই হো-হো করে হেসে
ফেললেন শ্যামল বাবু। বাবার এই আমোদে যোগ দিয়ে লালও হাসতে হাসতে বললো, "তা যা বলেছো।" এইভাবেই হাসি
ঠাট্টা করতে করতে দুজনে এগিয়ে গেল বাজারের দিকে।
বাজারঘাট
সব শেষ করে যখন বাড়ি ফেরা হল তখন বাজে দুপুর ১টা। বাজারের ব্যাগ মায়ের হাতে একরকম
নিক্ষেপ করে সোজা ছুটে গেল দোতলায়, নিজের
ঘরে। সেই কোন সকালে টেক্সট করেছে মেয়েটা, এখনো
তাকে কোনো রিপ্লাই দেওয়া হয়নি। এতক্ষনে যে তার রাগ আরো বেড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই
লালের। বাজারে যাওয়ার সময় ফোনটা সাথে নিয়ে যেতে বেমালুম ভুলে গেছিলো সে। ঘরে ঢুকেই
আগে ফোন খুলে কল করে ফেললো মিষ্টিকে।
কল
রিং হয়ে কেটে গেল, ফোন তুললো না সে। আরেকবার কল করায় এবার ফোন তুললো
মিষ্টি। ফোন তুলে, সামান্যের চেয়ে একটু বেশি গভীর
ভঙ্গিমায় "হুম, বল। " বলে লালের প্রত্যুত্তরের
অপেক্ষায় কিছুক্ষন মৌন ধারণ করল মিষ্টি। কি বলবে ভেবে না পেয়ে আমতা আমতা করে
জবাব দিলো, "তুই টেক্সট করেছিলি?... সরি
রে.. আসলে আমি না অ্যালার্ম দিয়েই ঘুমিয়েছিলাম, কিন্তু
কি যে হল, সকালে ...."
-"থাক!
আর মিথ্যে অজুহাত দিতে হবে না। আজ অবধি কোনোদিন অ্যালার্ম দিয়ে ঘুমিয়েছো তুমি?.... গতকাল কত করে বললাম যে কালকের দিনটা
অন্তত একটু সকালে উঠো, একটু ভিডিও কল করব। কিন্তু আমার কথা আর
কে শোনে?!"
মিষ্টির
এই এক অভ্যাস ছিল, লালের ওপর রেগে গেলে সে 'তুই' থেকে 'তুমি' তে চলে আসতো। আসন্ন বিপদের আভাস পেয়ে কিছুটা
বিপদগ্রস্থ বালকের মতো বারকয়েক 'সরি' বলেও যখন খুবএকটা কাজ হল না তখন অগত্যা
পরাজয় শিকার করা ব্যাতিত আর কিছুই করার থাকলো না লালের।
প্রতিপক্ষ
যে তর্কে পরাজিত হয়েছে তাতে আর কোনো সন্দেহ ছিল না মিষ্টির। কাজেই এবার কিছুটা সুর
নরম করে কথা বলা আবশ্যক।
-"ঠিক আছে, ঠিক আছে। আর অত নাটক করতে হবে না। ..... পুজোয় কোথায় যাবি কিছু ঠিক
করলি?"
-"এতে আবার এতো ভাববার কি আছে?.... কলকাতায় যেকোনো কোথাও গেলেই হয়। "
-"জীবনে কি কোনোকিছু নিয়ে একটু সিরিয়াস
হতে পারবি না?!! আমি কোথায় সকাল থেকে মাথা ঘামিয়ে
যাচ্ছি পুজোর প্ল্যানিং নিয়ে আর এদিকে তোর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই !... তুই খুব ভালো
করেই জানিস যে আমি কলকাতার রাস্তাঘাট প্রায় চিনি না বললেই হয়। "
-"আচ্ছা তাহলে আমাকে একটু সময় দে, আমি আজকের মধ্যেই একটা কিছু প্ল্যান
করে ফেলবো। "
এতক্ষনে
লালের কথা শুনে কিছুটা আশ্স্বস্ত হল মিষ্টি।
"তোর জন্যে একটা গিফট আছে। .... আজ দেখা
করতে পারবি ?"
"গিফট? কিসের গিফট?...
আবার এসব করতে গেলি কেন?.... তুই থাকতে আবার আমার কোন গিফটের
প্রয়োজন বল তো?" আমাদের লাল কুমার অনেকটা চাপা স্বভাবের
হলেও মাঝেমাঝে 'ফ্লার্ট' বেশ ভালোই করতে পারে। এরম একটা কথা শুনে মিষ্টির ফর্সা গাল যেনো
মুহূর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে গেল। মুচকি হেসে ধীর কণ্ঠে সে বললে- "আমি অতশত জানি
না। দেখা করবি কি না বল। "
এতদিনে
মিষ্টির সাথে সাক্ষাৎ করার কোনো সুযোগ ভুল করেও ছাড়েনি লাল, আজও তার অন্যথা হল না। বেলা অনেক হয়েছে, স্নান সেরে এবার নিচে যেতে হবে, তাই মিষ্টির প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে, বিকেল পাঁচটা নাগাদ দেখা করার
পরিকল্পনা করে সে অবশেষে ফোন রাখতে উদ্যত হল।
বাঙালিদের
মধ্যে পুজোর সময় সেই উপলক্ষে জামা কাপড় কেনার জন্যে আত্মীয়বর্গের ছোটোদের টাকা
দেওয়ার প্রথা আছে। প্রত্যেক বছর এই পুজোর সময় মিষ্টির কাকা এবং দুই মামার থেকে
প্রায় ২০০০-৩০০০ টাকা পাওনা হয়। সেই ধনরাশির পুরোটা জামা কিনে ব্যায় করে না সে।
এইবার তাই কিছুদিন আগেই হরিতলার পাঞ্জাবি মিউজিয়াম থেকে, কলেজ থেকে ফেরার পথে, লালের জন্যে একটা সুন্দর নীল রঙের
পাঞ্জাবি কিনেছে মিষ্টি। খুব সাবধানে সেটাকে আলমারির উপরে লুকিয়ে রেখেছে, দাদু-ঠাম্মির নজরের আড়ালে। তারা টের
পেলে যে সর্বনাশ হবে সেটা আর আলাদা করে বলার আশা করি প্রয়োজন নেই !
এদিকে
রায় বাড়িতে লাল পরল মহা বিভ্রান্তিতে। সে যে মিষ্টির জন্যে কিছুই কেনেনি! এই অল্প
সময়ে এই সমস্যার সমাধান কিভাবে করা যায় সেই নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে ভাতের
থালায় মাংসের টুকরোটা লাট্টুর মতো আঙ্গুল দিয়ে ঘুরিয়ে যাচ্ছে সে।
শ্যামল
বাবু মানুষটা খুব শান্ত হলেও খাবার নিয়ে অমন ছেলেখেলা তিনি একেবারেই পছন্দ করতেন
না। ছেলেকে এক ধমক দিলেন- "খোকা!! এসব কি হচ্ছে!? তোকে আমি কতবার বলেছি যে খাবার নিয়ে
ওরম রসিকতা করতে নেই !? মা অন্নপূর্ণা রুষ্ট হন। "
বাবার
বকুনিতে সম্মতি ফিরলো লালের। খাওয়া শেষে যখন উঠে হাত ধুতে উদ্যত হল, তখন আরো একবার বাবার কণ্ঠস্বর কানে
গেল- "তোর সেই বন্ধুটার খবর কি?"
-"কে? বিজয়?"
-"হুম। ... পুজোর ছুটিতে এসেছে বাড়িতে
নাকি ভুবনেশ্বরেই আছে ?"
-"না, এবার
আর আসেনি। পুজো শেষ হলেই ওর পরীক্ষা। " এইটুকু বলেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল লাল।
সত্যিই তো, সে বিজয়ের কথা বেমালুম ভুলে গেছিলো। এই
বিপদ থেকে যে একমাত্র সেই প্রানীটাই উদ্ধার করতে পারবে সেটা তো একবার ভেবে দেখা
হয়নি। নাহ, এবার তো একবার কল করতেই হবে তাকে।
যেমন
চিন্তা তেমন কাজ। ঘরে ঢুকেই তৎক্ষণাৎ ফোনে ডায়েল করে ফেলল বিজয়ের নাম্বার।
-"হ্যালো, বল। আজ হঠাৎ কি মনে করে। "
-"একটা ছোট্ট সমস্যায় পরেছি
ভাই।........" তারপর বিস্তারে ঘটনাটা উল্লেখ করে বন্ধুর কাছে উপদেশ প্রার্থনা
করল লাল।
পাড়ার
বুড়ো জেঠুদের মতো হালকা কেশে গলাটা ঝেড়ে নিয়ে বিদ্যাসাগরের মতো বিজয় প্রস্তুত করল
নিজের উপদেশ বাণী- "তবে শোনো বৎস। .... সমস্যাটা তেমন একটা জটিল না। বারাসাত
স্টেশনের কাছেই, ওই হেলা-বটতলার দিকে যে রাস্তাটা চলে
গেছে, ওখানে একটা মেয়েদের জুয়েলারি শপ আছে।
ওখানে অনেক ভালো ভালো আইটেম পেয়ে যাবি। .... চিন্তা নেই, দোকান তিনটে থেকে খুলে যায়। আশা করি
পর্যাপ্ত সময় পেয়ে যাবি কিছু কেনার মতো।"
এর
থেকে ভালো সমাধান এই সীমিত সময়ের মধ্যে জোগাড় করা লালের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
বন্ধুর উত্তম উপদেশে নিশ্চিন্ত হয়ে তাকে ধন্যবাদ জানালো সে। আর চিন্তা নেই, এইবার শুধু অপেক্ষা বিকেল হওয়ার।
মাছরাঙা পাখি যেমন মাছ ধরার জন্যে স্থির দৃষ্টিতে জলের দিকে তাকিয়ে থাকে, তার চেয়েও বেশি স্থির ভাবে লাল এবার
একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো দেওয়ালে ঝোলানো ব্রিটিশ আমলের ঘড়িটার দিকে। আর মাত্র আধ
ঘন্টার অপেক্ষা!