Saturday, 31 January 2026

শেষ দেখা (পর্ব ৭-৮)



 পর্ব: ৭

 

বাঙালিরা ঠিক যতটা উত্তেজনা নিয়ে সারা বছর অপেক্ষায় থাকে পুজোর জন্যে, ততটা উত্তেজনা পৃথিবীর কোনো জাতিরই নেই। পুজোর ওই কয়টা মাত্র দিনের জন্যেই বোধহয় বাঙালি সভ্যতা এতো রঙিন! বাঙালির কাছে দূর্গা পুজোটা শুধু একটা উৎসব নয়, এটা আমাদের আবেগ, আমাদের পরিচয়।

এবছরও পুজোর দিনগুলো মুহূর্তের মধ্যেই শেষ হয়ে চলে এলো বিজয়া দশমী। পুজো বেশ ভালোই কেটেছে লাল আর মিষ্টির। কিন্তু মাত্র দুই দিনের সাক্ষাতে মন ভরেনি তাদের, তাই আজকেও দেখা করাটা অতি আবশ্যক বলেই প্রতীত হয়েছে।

কলকাতার কোনো এক ঘাটে, যে জায়গা সাধারণত জনমানবশূন্যই থাকে, আজ বিজয়ার আমেজে লোকজনের ভিড় দেখা যাচ্ছে। মায়ের প্রতিমা গঙ্গার জলে বিসর্জন হচ্ছে।

"আসছে বছর আবার হবে!!, আসছে বছর আবার হবে!!, আসছে বছর, আবার হবে!!", বাঁকিদের সাথে লালও উচ্চারণ করল বাঙালির এই অতিপরিচিত আশ্বাসবাণী। এই দশমীর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে মন খারাপ, কষ্ট আর আবেগ। কারুরই মন চায় না ঘরের মেয়ে 'উমা' কে বিদায় জানাতে। কিন্তু হাজারো মন খারাপের মধ্যেই সিঁদুর খেলা আর মিষ্টিমুখের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে বিজয়া দশমীর, উমা ফিরে যান নিজের শশুরবাড়ি- কৈলাশে। 

 

সন্ধ্যে হয়ে আসছে, বাড়ি ফিরতে হবে। স্টেশনের দিকে হাটতে আরম্ভ করল দুজনে। লালকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে সে বেশ আনন্দেই আছে। ছোটবেলা থেকে প্রত্যেক বছরই পুজোর সময় ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে সে, কিন্তু এবারের পুজো নিঃসন্দেহে অন্যবারের সকল পুজোকে হার মানিয়েছে। মিষ্টির মুখেও শান্তির ছাপ সুস্পষ্ট।

লালের হাতটা আলতো করে ধরে লজ্জায় মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলো মিষ্টি। আগে মিষ্টির এই ধরণের যেকোনো কাজে অবাক হতো লাল, কিন্তু আজ আর সে খুব একটা অবাক বা অপ্রস্তুত হল না। বরং মনের মধ্যে এক বিচিত্র অনুভূতি হল তার, মিষ্টির নরম হাতের উষ্ণতা যেনো ছুঁয়ে ফেলেছে তার মনের সকল স্থান, আলোকিত করেছে তার মনে জমে থাকা একাকিত্ব, পূর্ণতা দিয়েছে তার বহুদিন পুরাতন ভালোবাসাকে।

সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে হাওয়া আন্দোলিত করে তুললো গাছের পাতাগুলো, বয়ে আনলো শিউলি ফুলের মিষ্টি সুবাস, আর সাথে যেনো আন্দোলিত করল তাদের হৃদয়কেও।

মিষ্টি- "জীবনে অনেককিছুই হারিয়েছি। তোকে হারাতে পারবো না। .... বড্ডো ভালোবেসে ফেলেছি। "

এই প্রথমবার নিজের প্রিয়তমার মুখে নিজেদের ভালোবাসার কথা উল্লেখ করতে শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হল লাল। আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যা আমরা চিরকাল নিজেদের মনের ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখতে চাই। লালের অবস্থাও এখন কিছুটা সেইরূপ।

-"আমি জীবনে হয়তো উল্লেখযোগ্য কিছু আজ অবধি হারাইনি, তবে তোকে হারালে জীবনে উল্লেখযোগ্য বলে আর কিছু থাকবে না। "

"তাই যেনো হয়...", বলেই লালের হাতটা আরো শক্ত করে চেপে ধরলো মিষ্টি।

"লাল?...", অনন্ত আকাশের ওপারে জোনাকির মতো উজ্জ্বল তারাগুলির দিকে তাকিয়ে, কিছুটা থেমে জিজ্ঞেস করল মিষ্টি। তার দৃষ্টি লক্ষ্য করে ধীর, স্নেহপ্রবণ স্বরে লাল বললে, "হুম.. বল। "

-" আমি কোনোদিন ট্রামে উঠিনি। একদিন নিয়ে যাবি?... কোথাও যাবো না, শুধু বসে থাকবো... তুই আর আমি। "

মিষ্টির হাতে অল্প চাপ দিয়ে সম্মতিসূচক ভাবে মাথা নাড়লো লাল- "নিশ্চই। "

আর কোনো কথা হল না দুজনের মধ্যে, বা বলা ভালো প্রয়োজন হল না, অনেক সময় মানুষের নিস্তব্ধতা এমন অনেক কিছু বলে দেয় যা ভাষায় ব্যাক্ত করা অসম্ভব।

ট্রেনে বাড়ি ফেরার পথে লালের কাঁধের ওপর হালকা করে নিজের মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরল মিষ্টি, আজ বড়ই ক্লান্ত সে। কিন্তু এই ক্লান্তি শুধুই শারীরিক, কারণ মন যে চায়না এই দিনটা আজ শেষ হোক।     

মিষ্টির ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজের কাঁধে ঝুলন্ত সাইডব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট, লেদারে মোড়ানো ডাইরি বের করে কি যেনো লিখতে আরম্ভ করল লাল। রবীন্দ্রনাথের মতো বড়ো মাপের কবি না হলেও খুব একটা খারাপ কবিতা লেখেনা ছেলেটা। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই লিখে ফেলল কবিতাটি।

 

ভালোবাসা

 

তুমি আছো হৃদয় জুড়ে, নিরবে প্রতিক্ষণে,

ভালোবাসা মিশে থাকে, দিগন্তের এক কোণে।

তোমার ছোঁয়া, বাতাসে ভেসে, ছুঁয়ে যায় মনখানি,

তোমার নামে জেগে ওঠে, প্রতিটি ভোরবেলা, আমি জানি।

 

বৃষ্টি নামে, তোমার কথা খেলে জলের মাঝে,

ভালোবাসা আঁকে ছবি, রঙিন সোনালী সাজে।

হোক না দেখা, হোক না বলা, তবুও তুমি পাস,

আমার প্রতি নিঃশ্বাসে — ভালোবাসার প্রকাশ।

 

কারেন্ট চলে যেতেই কম্পার্টমেন্টটা কিছু সময়ের জন্যে অন্ধকার হয়ে গেল। চাঁদের আলোয় আলোকিত, গভীর নিদ্রায় ডুবে থাকা মিষ্টির মুখখানি আরো মনোরম মনে হচ্ছে। কিছুক্ষন ছুটন্ত ট্রেনের জানালার বাইরে তাকিয়ে ডাইরির পেজটা উলটে দিল লাল। আবারো শোনা গেল পেনের খস-খস শব্দ। আরেকটা কবিতা লিখছে সে, এবারেরটা মিষ্টিকে নিয়ে-

 

মিষ্টি

 

তোমার নামটি মিষ্টি যেন, হাওয়ার শীতল গান,

চোখে তোমার চাঁদের আলো, মুখে হাসির টান।

হাসির মাঝে বাজে সুর, মনের গভীর বাঁশি,

তোমায় দেখে বলে মন, “শুধু তোমায় ভালোবাসি।”

 

তুমি এলে বসন্ত নামে, পাখি গায় নতুন রাগ,

মিষ্টি তুমি স্বপ্নমতন, দুচোখে রাখি মনের এক ভাগ।

তুমি ছাড়া ফাঁকা লাগে, জীবন নদীর পার,

মিষ্টি তুমি হৃদয় জুড়ে, ভালোবাসার সমাহার।

 

যত্ন করে ডাইরিটা আবার ব্যাগে ঢুকিয়ে, চোখ বুজে, মিষ্টির মাথার উপর নিজের মাথাটা রাখলো লাল। আজ দিনটা সত্যিই বড়ো ভালো। লাল মনে মনে ভাবলো-  'আজকের মতো যদি জীবনের বাকি দিনগুলোতেও তোকে পাই, তাহলে আর কিছু চাইনা আমার।'

পর্ব ৮

 

পুজো শেষ, কাজেই বাঙালিদের আবারো নিজের দৈনিন্দিন জীবনে ফিরে যাওয়ার সময় এসে গেছে। মিষ্টির-ও কলেজ খুলেছে আজকে। পুজোর কয়টা দিন এতো আনন্দসহকারে কাটানোর পর কলেজ যেতে যেন মন চাইছে না বছর ঊনিশের এই ছেলেমানুষ মেয়েটার।

কিন্তু ইচ্ছে না করলেই তো আর পড়াশোনায় ফাঁকি দিলে চলবে না, কলেজ তাকে যেতেই হবে। সামনেই পরীক্ষা।

অত্যন্ত ম্লান মুখে ব্যাগ গুছিয়ে রেডি হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামলো খাবার জন্যে। তারপর ঠিক প্রাচীন কালে যেভাবে সৈনিকেরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে সাহসের সাথে এগিয়ে যেতেন যুদ্ধওক্ষেত্রে, ঠিক সেই ভাবে মিষ্টিও রওনা হলো কলেজের জন্যে।

বেরোনোর আগে ঠাম্মির আওয়াজ কানে এলো, "সাবধানে যাস মা। দেখেশুনে রাস্তা পার হবি। "

"আসছি ঠাম্মি" বলে তার আদুরে ঠাম্মির গালে চুমু খেয়ে বেরিয়ে পড়লো কলেজের উদ্দেশ্যে।

 

বাসে উঠেই সিট মিলল। আরাম করে বসে ব্যাগ থেকে এবার ফোনটা বের করে হোয়াটস্যাপ খুললো মিষ্টি।

লালের টেক্সট- "আজ কলেজ যাবি নাকি?"

উত্তরে সে লিখলো- "এই সবে বাসে উঠলাম। ..... তুই কি করছিস?"

লাল তখন অনলাইন ছিল না। কাজেই হোয়াটস্যাপ এ আর সময় নষ্ট না করে ব্যাগের থেকে ইয়ারফোনে বের করে গান শুনতে থাকলো মিষ্টি- 'জিন্দেগী, এক সফর, হ্যা সুহানা.....'

 

হঠাৎ সজোরে ধাক্কা খেয়ে সিট থেকে আছড়ে পড়লো মিষ্টি। তার সাথে বাসের অন্যান্য সহযাত্রীদেরও একই অবস্থা। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো। মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রনা করছে। ডান হাতটা মনেহয় ভেঙে গেছে। চারিদিকে শুধু ধোঁয়া আর রক্ত ছড়িয়ে রয়েছে!

যন্ত্রনায় কাতর মিষ্টির কানে আবছা হয়ে ভেসে আসছে মানুষের করুন আর্তনাদ এবং আরো অনেক শব্দ।

আর কিছু শুনতে পারলো না মিষ্টি। সে জ্ঞান হারালো।

এদিকে কানের ইয়ারফোনে এখনও বেজে যাচ্ছে কিশোর কুমারের সেই বিখ্যাত গান- 'জিন্দেগী, এক সফর, হ্যা সুহানা। যাহা কাল ক্যা হো কিসনে জানা.....

 

বাস-টার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। মোড়ের মাথায় গাড়ি ঘোরানোর সময় উল্টো দিক থেকে এক লরি সজোরে ধাক্কা মারে বাসের সামনে।

কিছুক্ষনের মধ্যেই জায়গাটায় পুলিশ আর অ্যাম্বুলেন্সএর ভিড় জমেছে। রাস্তায় রীতিমতো শোরগোল পরে গেছে।

লম্বা ট্রাফিক জ্যাম তৈরী হয়েছে মুহূর্তের মধ্যেই।

রাস্তায় লোকজনকে ছোটাছুটি করতে দেখে একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলো- "ও দাদা !! বলছি এতো জ্যাম কিসের? কোনো দুর্ঘটনা হয়েছে নাকি?"

"আর বলবেন না দাদা। বাস আর লরি পুরো মুখোমুখি ধাক্কা খেয়েছে!!"

 

বাস থেকে দ্রুত যাত্রীদের নামিয়ে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মিষ্টির জ্ঞানশুন্য দেহটি অ্যাম্বুলেন্স করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মধ্যমগ্রাম স্টেট্ জেনারেল হসপিটালে।

ইতিমধ্যেই মিষ্টির ব্যাগ থেকে উদ্ধার করা আইডি কার্ড থেকে নম্বর জোগাড় করে বাড়িতে খবর দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে হাসপাতাল থেকে।

 

নিজের মনে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ছাদের ফুল গাছগুলোয় জল দিচ্ছিলেন শ্যামাচরণ বাবু। ফুলের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে ব্যস্ত এই  মানুষটা জানেই না যে ওদিকে কি ভয়ঙ্কর বিপদ ঘটে গেছে।

জোরে শব্দ করে বেজে উঠলো মাদুরের ওপর রাখা নোকিয়ার ছোট ফোনটা।

গাছপালা ছেড়ে, পকেটের মধ্যে থেকে চশমাটা বের করে চোখের ওপর মেলে ধরলেন বৃদ্ধ।

অচেনা নাম্বার দেখে মনে মনে ভাবলেন 'এটা আবার কার নাম্বার?', পরক্ষনেই কল রিসিভ করে ধীর, জিজ্ঞাসু স্বরে বললেন, "হ্যাঁ হ্যালো। কে বলছেন ?"

ওপাশ থেকে জবাব এলো- "আমি মধ্যমগ্রাম স্টেট্ জেনারেল হাসপাতাল থেকে বলছি। আপনি কি প্রিয়া দাশ- এর বাড়ির লোক বলছেন? .... আসলে বাস দুর্ঘটনায় উনি গুরুতর ভাবে আহত হয়েছেন.... এই মুহূর্তে ICU তে এডমিট করা হয়েছে। আপনি যত তাড়াতাড়ি পারেন আসুন।....... " আরো কয়েকটা কথা বলে গেলো লোকটা। কিন্তু এদিকে আতংঙ্কে শ্যামাচরণ বাবুর বুকের রক্ত জল হয়েছে। এই ঘটনা সত্যি তার সাথে ঘটছে কি না উনি যেন বুঝে উঠতে পারছেন না। নাহ! এখন এরমভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না! এক্ষুনি আগে পৌঁছাতে হবে হাসপাতালে!

 

হসপিটালে এদিকে ছুটোছুটি লেগে গেছে। বাসের অনেকজন যাত্রী গুরুতর আঘাত পেয়েছে। ৩ জন প্রায় মরণাপন্ন - যাদের মধ্যে একজনের নাম প্রিয়া দাশ!

এরপর যা ঘটলো তা আপনারা হয়তো খুব ভালো ভাবেই আন্দাজ করতে পারছেন।

না, মিষ্টিকে আর বাঁচানো গেলো না। বুকের ডান দিকে সিটের রডের দ্বারা সজোরে ধাক্কা লাগায় পাঁজরের দুটো হার ভেঙে ফুসফুসে ঢুকে গিয়েছিলো। যার ফলে ইন্টারনাল ব্লিডিং হয় এবং ফুসফুসে রক্ত ভরে যায়। নিঃশাস বন্ধ হয়ে যায় প্রিয়ার এবং কিছুক্ষনের মধ্যেই নাক-মুখ দিয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসে রক্ত! যন্ত্রনায় কাতর মুখখানি ছটফট করেছিল কিছুক্ষন। হয়তো জীবনের শেষ মুহূর্তে বাঁচার একটি শেষ চেষ্টা করছিলো মিষ্টি, চেষ্টা করছিলো শুধু আর একবার নিঃশাস নেওয়ার !

 

 

৪ বছর পর ....

স্থান: বারাসাত স্টেশন

নিষ্পলক দৃষ্টিতে একটানা ল্যাম্প পোস্টটার দিকে তাকিয়ে সিগারেটে একবার শেষ টান দিয়ে ছুড়ে ফেলল রাস্তার এক পাশে। উল্লেখিত যুবকটি আর কেউ নয়, লাল।

লালকে দেখে এখন অনেক অন্যরকম লাগে। আগের লালের সাথে বর্তমান এই মানুষটার কোনো মিল নেই। অতীতের কোনো কিছুরই ছাপ আর যেন নেই তার মধ্যে।

মিষ্টির মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েছিল লাল। ডিপ্রেশন-এ ভুগেছিলো প্রায় দুই বছর! মিষ্টির চলে যাওয়াটা আজও পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি সে। জীবন তাকে ভুলতে দেয়নি।

গাল ভর্তি দাড়ি, এলোমেলো চুল, অগোছালো বেশভূষা আর মুখে এক অদ্ভুত উদ্দেশ্যহীন দৃষ্টি। ল্যাম্প পোস্টের দিকে একবার শেষবারের মতো দৃষ্টিপাত করে মুখে ম্লান একটা হাসি এনে সুটকেসটা নিয়ে উঠে গেলো প্লাটফর্মে। পশ্চিম বঙ্গে আর থাকবে না লাল। বাবা-মা আগেই চলে গেছেন মালদায়, তার কাকার বাড়িতে। দিন পাঁচেক থেকে সেখান থেকে সপরিবারে রওনা হতে হবে ভুবনেশ্বরের উদ্দেশ্যে।

ট্রেন ইতিমধ্যেই এসে দাঁড়িয়েছে প্লাটফর্ম-এ। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে গেলো কম্পার্টমেন্টে। জানালার ধারে বসে লাল একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে প্লাটফর্মের একটা বেঞ্চের দিকে। সেই বেঞ্চটা! মুহূর্তেই যেন স্মৃতির ঢেউ খেলে গেলো লালের মনে। সেই বৃষ্টির জল, সেই প্রথম ঘুরতে যাওয়া। প্লাটফর্মের সিঁড়ি, বেঞ্চের শেড, বাবলুদার চায়ের দোকান, অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্প পোস্ট ! সবকিছুই যেন কিছু বলতে চাইছে তাকে। অজান্তেই দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দু-ফোটা জল। বুক ফেটে কান্না পাচ্ছে তার কিন্তু নিজেকে সামলানো ছাড়া তার কাছে আর কিছুই করার নেই !!

ট্রেন চলতে আরম্ভ করেছে। ধীরে ধীরে সব দৃশ্য মিলিয়ে যাচ্ছে। জানালার থেকে তাকিয়ে লাল যেন মনে মনেই বলে উঠলো, "চললাম রে!.... আমি চললাম!..... আমি যেতে চাইনি মিষ্টি.. কিন্তু এই পরিবেশ আমায় বাঁচতে দেবে না। এই গোটা শহর জুড়ে যে তোর স্মৃতি!"

ল্যাম্প পোস্টের আলোটা আচমকা নিভে গেলো। বোধহয় শেষ বিদায় জানালো সেই কিশোরকে যে আজ থেকে কিছু বছর আগেও দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতো একটি মেয়ের জন্যে। সে সাক্ষী থাকলো এই অসম্পূর্ণ প্রেমের কাহিনীর।.......

"আমাকে বিয়ে করবি?", লাজুক মুখ করে এই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলো একদিন একটি মেয়ে। তার উত্তরে লাল হালকা লজ্জা মুচকি হেসে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। মিষ্টির বলে সেই কথাটা যেন আজ কানে বাজছে তার। উত্তর আর দেওয়া হল না। জবাব শোনার মানুষটাই আর রইলো না!

 

সব প্রেমের গল্পের শেষটা ভালো হয় না। সব গল্পের শেষে হয়তো ওই "Happily ever after " থাকেনা। আমরা মনের মতন জীবন গড়ে তুলতে চাইলেও অদৃষ্টে কি লেখা তা বোঝা অসম্ভব, কাজেই বাস্তবকে মেনে জীবনে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকেনা মানুষের।

লাল আর মিষ্টির গল্পটাও ঠিক তেমন- অসম্পূর্ণ।  

No comments:

Post a Comment

A Heart That Forgot How

I loved just once- no second flame, No echo came, no whispered name. I gave my breath, my pulse, my days, And watched it all just slip away....