Saturday, 31 January 2026

শেষ দেখা (পর্ব ৭-৮)



 পর্ব: ৭

 

বাঙালিরা ঠিক যতটা উত্তেজনা নিয়ে সারা বছর অপেক্ষায় থাকে পুজোর জন্যে, ততটা উত্তেজনা পৃথিবীর কোনো জাতিরই নেই। পুজোর ওই কয়টা মাত্র দিনের জন্যেই বোধহয় বাঙালি সভ্যতা এতো রঙিন! বাঙালির কাছে দূর্গা পুজোটা শুধু একটা উৎসব নয়, এটা আমাদের আবেগ, আমাদের পরিচয়।

এবছরও পুজোর দিনগুলো মুহূর্তের মধ্যেই শেষ হয়ে চলে এলো বিজয়া দশমী। পুজো বেশ ভালোই কেটেছে লাল আর মিষ্টির। কিন্তু মাত্র দুই দিনের সাক্ষাতে মন ভরেনি তাদের, তাই আজকেও দেখা করাটা অতি আবশ্যক বলেই প্রতীত হয়েছে।

কলকাতার কোনো এক ঘাটে, যে জায়গা সাধারণত জনমানবশূন্যই থাকে, আজ বিজয়ার আমেজে লোকজনের ভিড় দেখা যাচ্ছে। মায়ের প্রতিমা গঙ্গার জলে বিসর্জন হচ্ছে।

"আসছে বছর আবার হবে!!, আসছে বছর আবার হবে!!, আসছে বছর, আবার হবে!!", বাঁকিদের সাথে লালও উচ্চারণ করল বাঙালির এই অতিপরিচিত আশ্বাসবাণী। এই দশমীর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে মন খারাপ, কষ্ট আর আবেগ। কারুরই মন চায় না ঘরের মেয়ে 'উমা' কে বিদায় জানাতে। কিন্তু হাজারো মন খারাপের মধ্যেই সিঁদুর খেলা আর মিষ্টিমুখের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে বিজয়া দশমীর, উমা ফিরে যান নিজের শশুরবাড়ি- কৈলাশে। 

 

সন্ধ্যে হয়ে আসছে, বাড়ি ফিরতে হবে। স্টেশনের দিকে হাটতে আরম্ভ করল দুজনে। লালকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে সে বেশ আনন্দেই আছে। ছোটবেলা থেকে প্রত্যেক বছরই পুজোর সময় ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে সে, কিন্তু এবারের পুজো নিঃসন্দেহে অন্যবারের সকল পুজোকে হার মানিয়েছে। মিষ্টির মুখেও শান্তির ছাপ সুস্পষ্ট।

লালের হাতটা আলতো করে ধরে লজ্জায় মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলো মিষ্টি। আগে মিষ্টির এই ধরণের যেকোনো কাজে অবাক হতো লাল, কিন্তু আজ আর সে খুব একটা অবাক বা অপ্রস্তুত হল না। বরং মনের মধ্যে এক বিচিত্র অনুভূতি হল তার, মিষ্টির নরম হাতের উষ্ণতা যেনো ছুঁয়ে ফেলেছে তার মনের সকল স্থান, আলোকিত করেছে তার মনে জমে থাকা একাকিত্ব, পূর্ণতা দিয়েছে তার বহুদিন পুরাতন ভালোবাসাকে।

সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে হাওয়া আন্দোলিত করে তুললো গাছের পাতাগুলো, বয়ে আনলো শিউলি ফুলের মিষ্টি সুবাস, আর সাথে যেনো আন্দোলিত করল তাদের হৃদয়কেও।

মিষ্টি- "জীবনে অনেককিছুই হারিয়েছি। তোকে হারাতে পারবো না। .... বড্ডো ভালোবেসে ফেলেছি। "

এই প্রথমবার নিজের প্রিয়তমার মুখে নিজেদের ভালোবাসার কথা উল্লেখ করতে শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হল লাল। আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যা আমরা চিরকাল নিজেদের মনের ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখতে চাই। লালের অবস্থাও এখন কিছুটা সেইরূপ।

-"আমি জীবনে হয়তো উল্লেখযোগ্য কিছু আজ অবধি হারাইনি, তবে তোকে হারালে জীবনে উল্লেখযোগ্য বলে আর কিছু থাকবে না। "

"তাই যেনো হয়...", বলেই লালের হাতটা আরো শক্ত করে চেপে ধরলো মিষ্টি।

"লাল?...", অনন্ত আকাশের ওপারে জোনাকির মতো উজ্জ্বল তারাগুলির দিকে তাকিয়ে, কিছুটা থেমে জিজ্ঞেস করল মিষ্টি। তার দৃষ্টি লক্ষ্য করে ধীর, স্নেহপ্রবণ স্বরে লাল বললে, "হুম.. বল। "

-" আমি কোনোদিন ট্রামে উঠিনি। একদিন নিয়ে যাবি?... কোথাও যাবো না, শুধু বসে থাকবো... তুই আর আমি। "

মিষ্টির হাতে অল্প চাপ দিয়ে সম্মতিসূচক ভাবে মাথা নাড়লো লাল- "নিশ্চই। "

আর কোনো কথা হল না দুজনের মধ্যে, বা বলা ভালো প্রয়োজন হল না, অনেক সময় মানুষের নিস্তব্ধতা এমন অনেক কিছু বলে দেয় যা ভাষায় ব্যাক্ত করা অসম্ভব।

ট্রেনে বাড়ি ফেরার পথে লালের কাঁধের ওপর হালকা করে নিজের মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরল মিষ্টি, আজ বড়ই ক্লান্ত সে। কিন্তু এই ক্লান্তি শুধুই শারীরিক, কারণ মন যে চায়না এই দিনটা আজ শেষ হোক।     

মিষ্টির ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজের কাঁধে ঝুলন্ত সাইডব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট, লেদারে মোড়ানো ডাইরি বের করে কি যেনো লিখতে আরম্ভ করল লাল। রবীন্দ্রনাথের মতো বড়ো মাপের কবি না হলেও খুব একটা খারাপ কবিতা লেখেনা ছেলেটা। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই লিখে ফেলল কবিতাটি।

 

ভালোবাসা

 

তুমি আছো হৃদয় জুড়ে, নিরবে প্রতিক্ষণে,

ভালোবাসা মিশে থাকে, দিগন্তের এক কোণে।

তোমার ছোঁয়া, বাতাসে ভেসে, ছুঁয়ে যায় মনখানি,

তোমার নামে জেগে ওঠে, প্রতিটি ভোরবেলা, আমি জানি।

 

বৃষ্টি নামে, তোমার কথা খেলে জলের মাঝে,

ভালোবাসা আঁকে ছবি, রঙিন সোনালী সাজে।

হোক না দেখা, হোক না বলা, তবুও তুমি পাস,

আমার প্রতি নিঃশ্বাসে — ভালোবাসার প্রকাশ।

 

কারেন্ট চলে যেতেই কম্পার্টমেন্টটা কিছু সময়ের জন্যে অন্ধকার হয়ে গেল। চাঁদের আলোয় আলোকিত, গভীর নিদ্রায় ডুবে থাকা মিষ্টির মুখখানি আরো মনোরম মনে হচ্ছে। কিছুক্ষন ছুটন্ত ট্রেনের জানালার বাইরে তাকিয়ে ডাইরির পেজটা উলটে দিল লাল। আবারো শোনা গেল পেনের খস-খস শব্দ। আরেকটা কবিতা লিখছে সে, এবারেরটা মিষ্টিকে নিয়ে-

 

মিষ্টি

 

তোমার নামটি মিষ্টি যেন, হাওয়ার শীতল গান,

চোখে তোমার চাঁদের আলো, মুখে হাসির টান।

হাসির মাঝে বাজে সুর, মনের গভীর বাঁশি,

তোমায় দেখে বলে মন, “শুধু তোমায় ভালোবাসি।”

 

তুমি এলে বসন্ত নামে, পাখি গায় নতুন রাগ,

মিষ্টি তুমি স্বপ্নমতন, দুচোখে রাখি মনের এক ভাগ।

তুমি ছাড়া ফাঁকা লাগে, জীবন নদীর পার,

মিষ্টি তুমি হৃদয় জুড়ে, ভালোবাসার সমাহার।

 

যত্ন করে ডাইরিটা আবার ব্যাগে ঢুকিয়ে, চোখ বুজে, মিষ্টির মাথার উপর নিজের মাথাটা রাখলো লাল। আজ দিনটা সত্যিই বড়ো ভালো। লাল মনে মনে ভাবলো-  'আজকের মতো যদি জীবনের বাকি দিনগুলোতেও তোকে পাই, তাহলে আর কিছু চাইনা আমার।'

পর্ব ৮

 

পুজো শেষ, কাজেই বাঙালিদের আবারো নিজের দৈনিন্দিন জীবনে ফিরে যাওয়ার সময় এসে গেছে। মিষ্টির-ও কলেজ খুলেছে আজকে। পুজোর কয়টা দিন এতো আনন্দসহকারে কাটানোর পর কলেজ যেতে যেন মন চাইছে না বছর ঊনিশের এই ছেলেমানুষ মেয়েটার।

কিন্তু ইচ্ছে না করলেই তো আর পড়াশোনায় ফাঁকি দিলে চলবে না, কলেজ তাকে যেতেই হবে। সামনেই পরীক্ষা।

অত্যন্ত ম্লান মুখে ব্যাগ গুছিয়ে রেডি হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামলো খাবার জন্যে। তারপর ঠিক প্রাচীন কালে যেভাবে সৈনিকেরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে সাহসের সাথে এগিয়ে যেতেন যুদ্ধওক্ষেত্রে, ঠিক সেই ভাবে মিষ্টিও রওনা হলো কলেজের জন্যে।

বেরোনোর আগে ঠাম্মির আওয়াজ কানে এলো, "সাবধানে যাস মা। দেখেশুনে রাস্তা পার হবি। "

"আসছি ঠাম্মি" বলে তার আদুরে ঠাম্মির গালে চুমু খেয়ে বেরিয়ে পড়লো কলেজের উদ্দেশ্যে।

 

বাসে উঠেই সিট মিলল। আরাম করে বসে ব্যাগ থেকে এবার ফোনটা বের করে হোয়াটস্যাপ খুললো মিষ্টি।

লালের টেক্সট- "আজ কলেজ যাবি নাকি?"

উত্তরে সে লিখলো- "এই সবে বাসে উঠলাম। ..... তুই কি করছিস?"

লাল তখন অনলাইন ছিল না। কাজেই হোয়াটস্যাপ এ আর সময় নষ্ট না করে ব্যাগের থেকে ইয়ারফোনে বের করে গান শুনতে থাকলো মিষ্টি- 'জিন্দেগী, এক সফর, হ্যা সুহানা.....'

 

হঠাৎ সজোরে ধাক্কা খেয়ে সিট থেকে আছড়ে পড়লো মিষ্টি। তার সাথে বাসের অন্যান্য সহযাত্রীদেরও একই অবস্থা। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো। মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রনা করছে। ডান হাতটা মনেহয় ভেঙে গেছে। চারিদিকে শুধু ধোঁয়া আর রক্ত ছড়িয়ে রয়েছে!

যন্ত্রনায় কাতর মিষ্টির কানে আবছা হয়ে ভেসে আসছে মানুষের করুন আর্তনাদ এবং আরো অনেক শব্দ।

আর কিছু শুনতে পারলো না মিষ্টি। সে জ্ঞান হারালো।

এদিকে কানের ইয়ারফোনে এখনও বেজে যাচ্ছে কিশোর কুমারের সেই বিখ্যাত গান- 'জিন্দেগী, এক সফর, হ্যা সুহানা। যাহা কাল ক্যা হো কিসনে জানা.....

 

বাস-টার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। মোড়ের মাথায় গাড়ি ঘোরানোর সময় উল্টো দিক থেকে এক লরি সজোরে ধাক্কা মারে বাসের সামনে।

কিছুক্ষনের মধ্যেই জায়গাটায় পুলিশ আর অ্যাম্বুলেন্সএর ভিড় জমেছে। রাস্তায় রীতিমতো শোরগোল পরে গেছে।

লম্বা ট্রাফিক জ্যাম তৈরী হয়েছে মুহূর্তের মধ্যেই।

রাস্তায় লোকজনকে ছোটাছুটি করতে দেখে একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলো- "ও দাদা !! বলছি এতো জ্যাম কিসের? কোনো দুর্ঘটনা হয়েছে নাকি?"

"আর বলবেন না দাদা। বাস আর লরি পুরো মুখোমুখি ধাক্কা খেয়েছে!!"

 

বাস থেকে দ্রুত যাত্রীদের নামিয়ে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মিষ্টির জ্ঞানশুন্য দেহটি অ্যাম্বুলেন্স করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মধ্যমগ্রাম স্টেট্ জেনারেল হসপিটালে।

ইতিমধ্যেই মিষ্টির ব্যাগ থেকে উদ্ধার করা আইডি কার্ড থেকে নম্বর জোগাড় করে বাড়িতে খবর দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে হাসপাতাল থেকে।

 

নিজের মনে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ছাদের ফুল গাছগুলোয় জল দিচ্ছিলেন শ্যামাচরণ বাবু। ফুলের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে ব্যস্ত এই  মানুষটা জানেই না যে ওদিকে কি ভয়ঙ্কর বিপদ ঘটে গেছে।

জোরে শব্দ করে বেজে উঠলো মাদুরের ওপর রাখা নোকিয়ার ছোট ফোনটা।

গাছপালা ছেড়ে, পকেটের মধ্যে থেকে চশমাটা বের করে চোখের ওপর মেলে ধরলেন বৃদ্ধ।

অচেনা নাম্বার দেখে মনে মনে ভাবলেন 'এটা আবার কার নাম্বার?', পরক্ষনেই কল রিসিভ করে ধীর, জিজ্ঞাসু স্বরে বললেন, "হ্যাঁ হ্যালো। কে বলছেন ?"

ওপাশ থেকে জবাব এলো- "আমি মধ্যমগ্রাম স্টেট্ জেনারেল হাসপাতাল থেকে বলছি। আপনি কি প্রিয়া দাশ- এর বাড়ির লোক বলছেন? .... আসলে বাস দুর্ঘটনায় উনি গুরুতর ভাবে আহত হয়েছেন.... এই মুহূর্তে ICU তে এডমিট করা হয়েছে। আপনি যত তাড়াতাড়ি পারেন আসুন।....... " আরো কয়েকটা কথা বলে গেলো লোকটা। কিন্তু এদিকে আতংঙ্কে শ্যামাচরণ বাবুর বুকের রক্ত জল হয়েছে। এই ঘটনা সত্যি তার সাথে ঘটছে কি না উনি যেন বুঝে উঠতে পারছেন না। নাহ! এখন এরমভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না! এক্ষুনি আগে পৌঁছাতে হবে হাসপাতালে!

 

হসপিটালে এদিকে ছুটোছুটি লেগে গেছে। বাসের অনেকজন যাত্রী গুরুতর আঘাত পেয়েছে। ৩ জন প্রায় মরণাপন্ন - যাদের মধ্যে একজনের নাম প্রিয়া দাশ!

এরপর যা ঘটলো তা আপনারা হয়তো খুব ভালো ভাবেই আন্দাজ করতে পারছেন।

না, মিষ্টিকে আর বাঁচানো গেলো না। বুকের ডান দিকে সিটের রডের দ্বারা সজোরে ধাক্কা লাগায় পাঁজরের দুটো হার ভেঙে ফুসফুসে ঢুকে গিয়েছিলো। যার ফলে ইন্টারনাল ব্লিডিং হয় এবং ফুসফুসে রক্ত ভরে যায়। নিঃশাস বন্ধ হয়ে যায় প্রিয়ার এবং কিছুক্ষনের মধ্যেই নাক-মুখ দিয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসে রক্ত! যন্ত্রনায় কাতর মুখখানি ছটফট করেছিল কিছুক্ষন। হয়তো জীবনের শেষ মুহূর্তে বাঁচার একটি শেষ চেষ্টা করছিলো মিষ্টি, চেষ্টা করছিলো শুধু আর একবার নিঃশাস নেওয়ার !

 

 

৪ বছর পর ....

স্থান: বারাসাত স্টেশন

নিষ্পলক দৃষ্টিতে একটানা ল্যাম্প পোস্টটার দিকে তাকিয়ে সিগারেটে একবার শেষ টান দিয়ে ছুড়ে ফেলল রাস্তার এক পাশে। উল্লেখিত যুবকটি আর কেউ নয়, লাল।

লালকে দেখে এখন অনেক অন্যরকম লাগে। আগের লালের সাথে বর্তমান এই মানুষটার কোনো মিল নেই। অতীতের কোনো কিছুরই ছাপ আর যেন নেই তার মধ্যে।

মিষ্টির মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েছিল লাল। ডিপ্রেশন-এ ভুগেছিলো প্রায় দুই বছর! মিষ্টির চলে যাওয়াটা আজও পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি সে। জীবন তাকে ভুলতে দেয়নি।

গাল ভর্তি দাড়ি, এলোমেলো চুল, অগোছালো বেশভূষা আর মুখে এক অদ্ভুত উদ্দেশ্যহীন দৃষ্টি। ল্যাম্প পোস্টের দিকে একবার শেষবারের মতো দৃষ্টিপাত করে মুখে ম্লান একটা হাসি এনে সুটকেসটা নিয়ে উঠে গেলো প্লাটফর্মে। পশ্চিম বঙ্গে আর থাকবে না লাল। বাবা-মা আগেই চলে গেছেন মালদায়, তার কাকার বাড়িতে। দিন পাঁচেক থেকে সেখান থেকে সপরিবারে রওনা হতে হবে ভুবনেশ্বরের উদ্দেশ্যে।

ট্রেন ইতিমধ্যেই এসে দাঁড়িয়েছে প্লাটফর্ম-এ। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে গেলো কম্পার্টমেন্টে। জানালার ধারে বসে লাল একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে প্লাটফর্মের একটা বেঞ্চের দিকে। সেই বেঞ্চটা! মুহূর্তেই যেন স্মৃতির ঢেউ খেলে গেলো লালের মনে। সেই বৃষ্টির জল, সেই প্রথম ঘুরতে যাওয়া। প্লাটফর্মের সিঁড়ি, বেঞ্চের শেড, বাবলুদার চায়ের দোকান, অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্প পোস্ট ! সবকিছুই যেন কিছু বলতে চাইছে তাকে। অজান্তেই দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দু-ফোটা জল। বুক ফেটে কান্না পাচ্ছে তার কিন্তু নিজেকে সামলানো ছাড়া তার কাছে আর কিছুই করার নেই !!

ট্রেন চলতে আরম্ভ করেছে। ধীরে ধীরে সব দৃশ্য মিলিয়ে যাচ্ছে। জানালার থেকে তাকিয়ে লাল যেন মনে মনেই বলে উঠলো, "চললাম রে!.... আমি চললাম!..... আমি যেতে চাইনি মিষ্টি.. কিন্তু এই পরিবেশ আমায় বাঁচতে দেবে না। এই গোটা শহর জুড়ে যে তোর স্মৃতি!"

ল্যাম্প পোস্টের আলোটা আচমকা নিভে গেলো। বোধহয় শেষ বিদায় জানালো সেই কিশোরকে যে আজ থেকে কিছু বছর আগেও দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতো একটি মেয়ের জন্যে। সে সাক্ষী থাকলো এই অসম্পূর্ণ প্রেমের কাহিনীর।.......

"আমাকে বিয়ে করবি?", লাজুক মুখ করে এই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলো একদিন একটি মেয়ে। তার উত্তরে লাল হালকা লজ্জা মুচকি হেসে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। মিষ্টির বলে সেই কথাটা যেন আজ কানে বাজছে তার। উত্তর আর দেওয়া হল না। জবাব শোনার মানুষটাই আর রইলো না!

 

সব প্রেমের গল্পের শেষটা ভালো হয় না। সব গল্পের শেষে হয়তো ওই "Happily ever after " থাকেনা। আমরা মনের মতন জীবন গড়ে তুলতে চাইলেও অদৃষ্টে কি লেখা তা বোঝা অসম্ভব, কাজেই বাস্তবকে মেনে জীবনে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকেনা মানুষের।

লাল আর মিষ্টির গল্পটাও ঠিক তেমন- অসম্পূর্ণ।  

শেষ দেখা (পর্ব ৫-৬)

 


পর্ব: ৫

 

আজ প্রায় ছয় মাস হয়ে গেছে। এর মধ্যে লালের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ আর অনলাইন টেক্সট এবং ভিডিওকলে কথা বলাটা খুবই স্বাভাবিক দৈনিন্দিন ক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। দুজনের মধ্যে কেউই এখনো প্রপোস করেনি ঠিকই, কিন্তু নিজেদের ব্যাবহারে আর কথার মিষ্টতায় প্রেমের ভাব অতি স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে।

মাসটা এখন অক্টোবর, শরৎকাল। শরৎকাল বাঙালিদের কাছে খুবই বিশেষ এক ঋতু। ঘাসের সবুজে সাদা মুকুটের মতো কাশফুল বয়ে আনে মায়ের আগমনী বার্তা। গোটা বিশ্বের লোক বাঙালিদের নামের সাথে জুড়ে দেয় বাংলার বিখ্যাত 'রসোগোল্লা' আর উৎসবের মধ্যে সবার সেরা 'দুর্গোৎসব'

আজ মহালয়া, দেবীপক্ষের সূচনায় আর মাত্র একদিনের অপেক্ষা। মহালয়ার দিন আজকালকার ছেলে মেয়েরা টিভিতে মহালয়া দেখতেই বেশি পছন্দ করে অথবা আমাদের লাল কুমারের মতো ঘুমিয়ে কাটানোয় ব্যায় করে, তবে আমাদের মিষ্টির পছন্দ একটু অন্য ধরণের। প্রত্যেক বছর তার এই শুভ দিনটি শুরু হয় বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র -র কণ্ঠে মহালয়া পাঠ শুনে। এ বছরও এই সুপ্রাচীন নিয়মের ব্যাতিক্রম দেখা গেলো না। ভোর সাড়ে চারটে বাজতেই চালানো হল মহালয়া।

বাইরে প্রায় অন্ধকার, সূর্য সবে একটু উঁকি মারছে নীল আকাশের ওই তুলোর মতো সাদা মেঘের আড়ালে। মিষ্টি বরাবরই একটু ঠাকুর ভক্ত। বীরেন্দ্র কৃষ্ণের বজ্র কণ্ঠে মায়ের স্তুতি শুনতে শুনতে কখন যে চোখের কোণে জল জমেছে তা বুঝতে পারেনি। নিজের ঘরের জানালা থেকে বাইরে তাকিয়ে হাত জোর করে কি যেন প্রার্থনা করছে সে। সূর্যের সোনালী আভায় তার মুখে ফুটে উঠেছে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা, কোমল হৃদয়ের অধিকারীনি এই মেয়েটির প্রার্থনা বুঝি মা শুনেছেন। 

সময়- সকাল আটটা। সকাল সকাল স্নান, পুজো, ইত্যাদি সকল কাজ সেরে নিজের পকেট ডায়েরি খুলে আর হাতে মোবাইলে ক্যালেন্ডার খুলে, খুব মনোযোগ সহকারে, পুজোয় কবে এবং কোথায় ঘুরতে যাওয়া হবে সেই প্ল্যানের একটা হেস্তনেস্ত করার সংকল্প নিয়ে খাটের উপর বুদ্ধ মূর্তি ধারণ করে বসেছে মিষ্টি। তৃতীয়ায় আর অষ্টমীর দিন লালের সাথে বেরোবে সে, আর বাকি কোন দিন বন্ধুবান্ধবের সাথে বেরোবে সেইসব নিয়ে নিজের শান্ত মাথাকে ব্যাস্ত করে পেন ঘসেই চলেছে তার সেই জীর্ণ ছোটো ডাইরিতে। এমনসব 'গুরুত্বপূর্ণ' কাজে যখন সে ভীষণ ব্যাস্ত, তখনি একটা কল এলো তার ফোনে। না, এই কল আমাদের লাল বাবুর একেবারেই না, সে তো এখন ঘুমে কাদা হয়ে মিষ্টির স্বপ্ন দেখতেই ব্যাস্ত!    

কলটা শিউলির। শিউলি মিষ্টির সবথেকে কাছের বন্ধু। ছোটবেলা থেকে একই স্কুলে পড়ে বড়ো হয়েছে দুই বন্ধু।  এদের দুজনের বন্ধুত্ব অনেকটা সেই লাল আর বিজয়ের মতোই। ছোটবেলার থেকেই মিষ্টির সুখ দুঃখ, সব ভাগ করে নিয়েছে শিউলি। তার মা বাবার অভাব কেউ কোনোদিন পূরণ করতে পারেনি ঠিকই কিন্তু একটা বোনের মতো তার পাশে থেকে সেই অভাব পূরণ করতে সক্ষম শিউলি। কল তুলে কিছু বলতে যাবে মিষ্টি তার আগেই ওপার থেকে অনর্গল বোকা আরম্ভ করে দিল শিউলি। তার কথার বেগ বুঝি রাজধানী এক্সপ্রেসকেও হার মানায়!

"কিরে মিঠু কি খবর তোর? বলি আমাকে তো প্রায় ভুলেই গেছিস। অবশ্য ভুলবি নাই বা কেন, নতুন বয়ফ্রেন্ড জুটেছে বলে কথা! এখন আর আমার কিসের প্রয়োজন। আমি তো এখন তোর জীবনে মমিফাইড ইতিহাসের চেয়েও পুরাতন, আমায় আর...."

-"তুই থামবি?! মানে সকাল সকাল এতো বকার এনার্জি পাস কথা থেকে? মানে মানুষ অন্তত একটু নিঃশেষ নেওয়ার জন্যেও তো থামে রে বাবা। "

-"হ্যা হ্যা, সে তো বটেই। আমার কথা তো এখন ভাট বোকা মনে হবেই। হায় ভগবান! শেষমেশ তুইও ভুলিয়ে দিলি আমায়। এখন বুঝতে পারছি লোকজন কেন বলে যে ভালোবাসা অন্ধ !!"

অন্য কোনো বিষয়ে মিষ্টির মতো শান্ত মস্তিষ্কের মানুষকে উত্তক্ত করা বেজায় কঠিন হলেও এইবার বিফল হয়নি শিউলি। কিছুটা বিরক্তির সুরেই মিষ্টি বলে উঠলো, "নে অনেক হয়েছে। আর না। সবসময় কিন্তু এরম ফাজলামি আমার ভালো লাগে না শিউলি !"

-" আচ্ছা বাবা আর বলবো না। রাগ করিস না। দেখা গেলো মহিষাসুর বধের আগে তুই-ই আমাকে বধ করে ফেলবি।"

শিউলির এই শিশুসুলভ ব্যাজ্ঞপ্তিতে হেসে ফেললো মিষ্টি। হাসির চোটে তার রাগের প্রভাব যাতে সম্পূর্ণ মুছে না যায় সেই জন্যে যথাসম্ভব হাসি সংবরণ করে কিছুটা গাম্ভীর্যের সাথে বলল, 

-"বল কি বলবি।"     

-"কেন রে? সবসময় কিছু বলবো বলেই কল করতে হবে নাকি তোকে? একটু তো কথা বলতেও ইচ্ছে করে নাকি?"

-"আরে না না, আমি সেটা বলছি না..."

-"হয়েছে, হয়েছে। আর অত কৈফিয়ত দিতে হবে না! পুজোয় কবে কোথায় যাবি কিছু ঠিক করলি?"

-"সেটাই করছিলাম রে পাগলী। কিন্তু আমি আগে থেকেই বলে রাখি, আমি কিন্তু তৃতীয়া আর অষ্টমীর দিন বেরোতে পারবো না। "

ওই দুই দিন যে মিষ্টি কার সাথে বেরোবো তা কতটা আন্দাজ করতে পেরেছিলো শিউলি। কাজেই বান্ধবীকে জ্বালাতন করার এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া না করে দ্রুত প্রশ্ন করলো-

"লালের সাথে বেরোবি, তাই না?"

ওপার থেকে সলজ্জ উত্তর এলো, "হ্যা। "

-"আমি না এখনো বুঝতে পারিনা, তুই কি এমন দেখলি ওই সজনে ডাঁটার মতো ছেলেটার মধ্যে?"

-"এই শিউলি! এ আবার কি ধরণের কথা ?!"

-"আরে বাবা সিরিয়াসলি নিশ না। আমি একটু মজা করছিলাম মাত্র। "

-"ওর মধ্যে যে কি দেখেছি তা শুধু আমিই জানি। ছেলেটার মধ্যে কোনো জটিলতা নেই জানিস? আর ভালোবাসা বস্তুটা রূপ দেখে হয়না, হয় শুধু যত্ন আর সম্মানের থেকে।"

-"হুম, বুঝলাম। যাক বাবা, এতদিনে কেউ তো এমন এলো যে তোকে মন থেকে ভালোবাসে।", একটা ছোটো দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলল, "আমার পোড়া কপালে আর কেউ জুটলো না! শুধু এই মশাগুলোই আমাকে অকাতরে ভালোবেসে সযত্নে চুমু খেয়ে গেলো!"

শিউলির শেষ উক্তিটি শুনে মিষ্টি আর হাসি রোধ করতে পারলো না। দুজনেই কমপক্ষে দুই মিনিট ধরে পাগলের মতো হেসে গেল।

-"কোথায় যাবো এখনো পুরোপুরি কিছু ঠিক করিনি, তবে অত্যাধিক ভিড় ঠেলে ঠাকুর দেখার ইচ্ছে আমার খুবএকটা নেই। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবো। আর ভাবছি অষ্টমীর দিন ওর সাথে একটু কফি হাউস এ যাবো। "

-"ধ্যাৎ! আজকাল আবার কে কফি হাউসে যায় রে? ওরে বোন, কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, আজ আর নেই। "

কিছুটা হেসে মিষ্টি উত্তর দিল, "তা অবশ্য ঠিক বলেছিস। কিন্তু জানিনা কেন জায়গাটা আমার বেশ ভালোই লাগে। দেখি কোথায় যাওয়া যায়। আমি তো আবার কলকাতার রাস্তাঘাট তেমন একটা চিনি না। "

-"দেখ কোথায় যাবি। তবে তার থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল যে কি করবি ওই দুদিন?"

-"বড্ডো বেশি আগ্রহ দেখছি তোমার? সেসব কেন জানাবো তোকে?"

-"সেই, সেই, আমাকে আর কেন জানাবি? আমি তো আর তোর কেউ নোই। "

-"তুই আবার শুরু করলি?.... আচ্ছা শোন্, আবার পরে কথা হবে। ওদিকে ঠাম্মি ডাকছে। দেখি কি হল। আর শোন্, বলছি যে তুই, আমি আর শিবু নাহয় ষষ্ঠীর দিন যাবো উত্তর কলকাতায় ঠাকুর দেখতে। ওকে বলে দিস ফোন করে। "

-"ওকে, টাটা। তাহলে দেখা হচ্ছে ষষ্ঠীর দিন। "

এদিকে মিষ্টির ঠাকুমা তাকে ডেকেই যাচ্ছে , "দিদিভাই, ও দিদিভাই! একটু এদিকে আয় না মা। আমার চশমাটা খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও। এর মধ্যে কোন ওষুধটা..."

"হ্যা ঠাম্মি, আসছি!", বলে ফোনটা রেখে দ্রুত পায়ে মিষ্টি ছুটলো দাদু-ঠাম্মার ঘরের দিকে।

ঘরে প্রবেশ করেই জিজ্ঞাসু সুরে তাকে আহ্বানের হেতু জিজ্ঞেস করায় তার ঠাকুমা গোটা ওষুধের বাক্সটা নাতনির সামনে ধরে বললেন, "দেখ তো দিদিভাই এর মধ্যে কোন ওষুধটা সেই সকালে খালি পেটে খেতে হবে?"

দাদু-ঠাম্মার এখন যথেষ্ট বয়েস হয়েছে, কাজেই একেবারে মায়ের মতো করে যত্ন করে সে তার আদরের দাদু-ঠাম্মিকে। ওষুধের বাক্স হাতড়ে মুহূর্তের মধ্যে একটা পাতা তুলে, ট্যাবলেট বের করে এগিয়ে দিল ঠাম্মির দিকে। ধীরে ধীরে জলের গ্লাসটা নিয়ে ট্যাবলেটের সদ্গতি করে প্রশ্ন করলেন তাঁর আদরের নাতনিকে- "কি করছিলি রে দিদিভাই? কে ফোন করলো?"

মিষ্টি আদুরে গলায় জবাব দিল, "ওই শিউলি ফোন করেছিল। পুজোয় কোথায়, কবে, যাওয়া হবে সেইসব নিয়ে কথা হচ্ছিলো। "

-"বাহ্, ভালো ভালো। তবে রাত জেগে ঠাকুর দেখতে যেন যাস না আবার। তোর দাদান কিন্তু খুব রাগ করবে। "

-"না না, রাত জেগে ঠাকুর দেখার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। প্রত্যেক বছর যেমন যাই, তেমনি যাবো। আচ্ছা দাদান কোথায় গো ঠাম্মি? সকাল থেকে দেখছি না তো। বাজারে গেছে ?"

-"হ্যা, আজকে মহালয়া বলে কথা! তাই সকাল সকাল বেরিয়ে গেছে বাজার করতে। আজ তোর জন্য একটু খাসির মাংস আনতে বললাম। অনেকদিন হল বাড়িতে খাসি আনা হয়নি। "

মিষ্টির দাদুর নাম শ্যামাচরণ দাস, পেশায় ছিলেন শিক্ষক। প্রায় ৮০-র ওপর বয়েস হবে ভদ্রলোকের, কিন্তু এখনো তার চেহারা বলিষ্ঠ, নীরোগ দেহ, এবং তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কের অধিকারী। মহালয়ার দিনটা তার কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ, মায়ের আগমন বলে কথা ! বহু বছর ধরে ফিজিক্সের শিক্ষকতা করলেও ঈশ্বরের প্রতি তার বিশ্বাস অবাক করার মতো। গলায় তার ১০৮ টা বীজের পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে লাল চন্দনের তিলক কাটা, বেশভূষা অতি সাধারণ - সাদা ধুতি আর হালকা রঙের কুর্তা/পাঞ্জাবি, দেখে মনেহয় কোনো মন্দিরের তন্ত্র সাধক।

ঠাম্মির কাছে আদর আহ্ললাদ পেলেও দাদুর কাছে সেটা খুব একটা জোটেনি মিষ্টির। নাতনিকে অত্যন্ত স্নেহ করলেও কোনোদিন শাসনের অভাব রাখেননি শ্যামাচরণ বাবু। কাজেই বলা বাহুল্য যে ভয় যদি মিষ্টি কাউকে করে থাকে তাহলে সেটা তার দাদুকে। দাদুর কড়া শাসনের মধ্যে বড়ো হলেও দাদানের প্রতি ভালোবাসার কোনো খামতি ছিল না মিষ্টির।

"উফফ! কতবার বলেছি দাদান-কে যে এই বয়েসে একা একা এতো বাজার না করতে। বলি আমাকে নিয়ে গেলে কি অসুবিধা হত শুনি?"

-"সে কি আর হয় রে মা? তোর দাদানকে তো চিনিস। বয়স হলে কি হবে? বয়েস যে হয়েছে সেটা মানলে তবে তো! এখনো সব কাজে 'আমি একাই একশো' ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। " 

-"তা যা বলেছো ঠাম্মি !"

এরপর মিষ্টি আবার ফিরে যায় তার ঘরে। ঘরে ঢুকেই ফোন খুলে হোয়াটস্যাপ চেক করে সে। নাহ, কোনো মেসেজ আসেনি 'তার' তরফ থেকে। তাহলে কি এখনো ঘুমাচ্ছে?! ছেলেটা পারেও বটে ! কি করবে ভেবে না পেয়ে নিজেই টেক্সট করল লালকে, "গুড মর্নিং। মানে আজকে তো অন্তত একটু সকাল সকাল উঠতে পারতিস! কত ঘুম লাগে তোর?"

ওপার থেকে কোনো জবাব আসলো না দেখে ফোনটা বিছানায় নিক্ষেপ করে, নুপুরের ঝুম ঝুম শব্দ করে মিষ্টি চলে গেল সংসারের কাজে ঠাম্মিকে সাহায্য করতে। মনে মনে ভাবলো, "ঘুমোক শয়তানটা! সারাদিন শুধু ঘুমিয়েই যাচ্ছে ! একবার শুধু কল করুক, তারপর ওর হচ্ছে!!"



 

পর্ব: ৬

 

 "ওই বাঁদর! আর কত ঘুম লাগে তোর? এদিকে বেলা কত হয়েছে তা খেয়াল আছে?.... অন্তত আজকের দিনটা তো একটু সকাল সকাল উঠতে হয়!", রুমা দেবীর তীক্ষ্ণ তিরস্কারে গোটা ঘর যেন কেঁপে উঠলো। গভীর নিদ্রায় শায়িত লাল এবার ভীষণভাবে অপ্রস্তুত অবস্থায় উঠে বসলো বিছানায়। ছেলের উত্তর না পেয়ে আরো একবার অন্তিম সতর্কবার্তা ঘোষণা করে রুমা দেবী বললেন, "তুই কি উঠলি নাকি যেতে হবে আমাকে? আর যদি একবার ডাকতে হয় খুব খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু বাবু!!..... ওই শয়তান!" নিজের জীবনের চেয়েও প্রিয় ঘুমে ব্যাঘাত পেয়ে অতীব বিরক্তির সাথে লাল নিজের কণ্ঠ্যস্বর দুই ঘর বাড়িয়ে উত্তর দিলো, "উঠেছি!!"

মিষ্টির বিপরীত, লালের কাছে মহালয়ার কোনো বিশেষ প্রাধান্য নেই, কাজেই এমন ঘুমিয়ে দিন কাটিয়ে দেওয়ার সুযোগ মোটেও হাতছাড়া করতে চায়নি সে। কিন্তু মায়ের ডাক অমান্য করার সাহস লালের নেই, অগত্যা শয্যা ত্যাগ করাটাই শ্রেয়।

বর্তমান প্রজন্মের আর পাঁচটা ছেলে মেয়ের মতো লালও ঘুম থেকে উঠে নিজের ফোনকে অবহেলা করে উঠে যেতে অসক্ষম। তাই প্রতিদিনের অভ্যাস মতো আজও সবার আগে ফোনের দিকেই নজর গেল। ঘুমন্ত চোখগুলো ডলতে ডলতে যেই স্ক্রিন অন করলো, তার ওপর ভেসে ওঠা নোটিফিকেশন দেখে মুহূর্তের মধ্যেই সমস্ত ঘুম যেন বাস্প হয়ে মিলিয়ে গেল। মিষ্টির টেক্সট !

প্রেমিকার টেক্সট পড়ে দিনের শুভারম্ভ করতে চায়না এমন প্রেমিকের অস্তিত্ব আছে কি না বলা ভার। দুরন্ত গতিতে হোয়াটস্যাপ খুলে টেক্সট পড়তে আরম্ভ করলো লাল। মুখে যেন তার হাসি আর ধরে না!

কিন্তু একী? যে ধরণের টেক্সট সে আশা করেছিল এ যে তার ঠিক বিপরীত! ঠিক যে গতিতে তার মুখ হাসিতে ফুটে উঠেছিল বোধ করি তার চেয়েও দ্বিগুন গতিতে তা পরিণত হল ভয় আর বিস্ময়ের মিশ্রিত অভিব্যক্তিতে।

মেয়েটা রেগে গেছে। প্রেম করার এই এক ঝামেলা। মানব জাতির এই হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে অনেক রহস্যের সন্ধান এবং সমাধান মিললেও নারী জাতির মনের রহস্যের উদ্ঘাটন করতে ব্যার্থ পুরুষ সমাজ। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে মানুষের আশা আকাঙ্খার কোনো শেষ নেই, কিন্তু সেসব থেকে আলাদা আমাদের লাল শুধু একটু ঘুমোতেই তো চেয়েছে! না সে চায় রত্নভাণ্ডার না অন্য কোনো লোভনীয় সুখ, তার পক্ষে নিদ্রাই পর্যাপ্ত। কিন্তু এই সামান্য চাহিদাটাই যেন সমাজ মেনে নিতে চাইছে না, তা সে মা হোক অথবা মিষ্টি।

প্রণয়িনীর রাগ ভাঙানোর অভিযানে এখন প্রথম পদক্ষেপ কি হওয়া উচিত তা নিয়ে বিচার করার সময় নেই। এক্ষুনি একবার স্বশরীরে মা-কে দর্শন না দিলে যে বাড়িতেও একটা কুরুক্ষেত্র বাধবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই!  

সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় জননীর সাথে চোখাচোখি হতেই রুমা দেবী আরো একবার গর্জে উঠলেন- "এতক্ষনে ঘুম হল?!", পাশের ঘরের দিকে তাকিয়ে এবার কাকে যেনো উদ্দেশ্য করে বললেন, "আর ওই আরেকজন এখনো কি সুন্দর নির্লজ্জের মতো শুয়ে আছে!" স্ত্রী-এর কোথায় এবার বুঝি একটু টনক নড়লো শ্যামল বাবুর। যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি বিছানা ত্যাগ করে নিজের সেকেলে যুগের গোল, কালো ফ্রেমের চশমাটা পরিধান করে, নিজের প্রকান্ড ভুঁড়ির উপর হাত বোলাতে বোলাতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি।

স্বামী-পুত্রের প্রতি আবারো একটি কটাক্ষ ছুড়ে বললেন- "যেমন বাবা তার তেমনি ছেলে! ভোর বেলা উঠে সারাদিন শুধু সংসারের কাজ করে যাওয়াটা যেনো একমাত্র আমারই দায়িত্ব!... বলি বাপ্ বেটা মিলে অন্তত বাজারটা তো করে আনতে পারো নাকি !!?"

গিন্নির হুঙ্কার থেকে মুক্তি পাওয়ার এখন একটাই উপায়- 'বাজার অভিযান'। কাজেই আর বিলম্ব না করে বাজারের ব্যাগ নিয়ে, ছেলেকে চোখের ইশারায় সঙ্গে আসতে নির্দেশ করলেন। বাড়ির হাওয়া গরম, ঠান্ডা হতে সময় লাগবে, কাজেই মায়ের বকুনি থেকে রেহাই পেতে লাল কোনো প্রতিবাদ না করে চুপচাপ তার বাবাকে অনুসরণ করল।

শ্যামল বাবু লোকটা ভীষণ সাদামাটা। ছোটবেলা কেটেছিল অভাব অনটনে, তাই অল্প বয়েস থেকেই কাঠের ব্যবসায় যোগ দেন এবং কিছু কালের মধ্যেই বিপুল ধন-সমপত্তির অধিকারী হয়ে ওঠেন তিনি। টাকা পয়সার কোনো অভাব না থাকলেও লোকটার মধ্যে কোনো সময় দাম্ভিকতা দেখা যায়নি। আজও তার পোশাক পরিচ্ছদ অতি সাধারণ, দেখে কেউ বলতেই পারবেন না যে তিনি অত ধনী ব্যেক্তি।

"এক্ষুনি না বেরোলে বোধহয় তোর মা মেরেই ফেলতো আমায় !" কথাটা বলেই হো-হো করে হেসে ফেললেন শ্যামল বাবু। বাবার এই আমোদে যোগ দিয়ে লালও হাসতে হাসতে বললো, "তা যা বলেছো।" এইভাবেই হাসি ঠাট্টা করতে করতে দুজনে এগিয়ে গেল বাজারের দিকে।

বাজারঘাট সব শেষ করে যখন বাড়ি ফেরা হল তখন বাজে দুপুর ১টা। বাজারের ব্যাগ মায়ের হাতে একরকম নিক্ষেপ করে সোজা ছুটে গেল দোতলায়, নিজের ঘরে। সেই কোন সকালে টেক্সট করেছে মেয়েটা, এখনো তাকে কোনো রিপ্লাই দেওয়া হয়নি। এতক্ষনে যে তার রাগ আরো বেড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই লালের। বাজারে যাওয়ার সময় ফোনটা সাথে নিয়ে যেতে বেমালুম ভুলে গেছিলো সে। ঘরে ঢুকেই আগে ফোন খুলে কল করে ফেললো মিষ্টিকে।

কল রিং হয়ে কেটে গেল, ফোন তুললো না সে। আরেকবার কল করায় এবার ফোন তুললো মিষ্টি। ফোন তুলে, সামান্যের চেয়ে একটু বেশি গভীর ভঙ্গিমায় "হুম, বল। " বলে লালের প্রত্যুত্তরের অপেক্ষায় কিছুক্ষন মৌন ধারণ করল মিষ্টি। কি বলবে ভেবে না পেয়ে আমতা আমতা করে জবাব  দিলো, "তুই টেক্সট করেছিলি?... সরি রে.. আসলে আমি না অ্যালার্ম দিয়েই ঘুমিয়েছিলাম, কিন্তু কি যে হল, সকালে ...."

-"থাক! আর মিথ্যে অজুহাত দিতে হবে না। আজ অবধি কোনোদিন অ্যালার্ম দিয়ে ঘুমিয়েছো তুমি?.... গতকাল কত করে বললাম যে কালকের দিনটা অন্তত একটু সকালে উঠো, একটু ভিডিও কল করব। কিন্তু আমার কথা আর কে শোনে?!"

মিষ্টির এই এক অভ্যাস ছিল, লালের ওপর রেগে গেলে সে 'তুই' থেকে 'তুমি' তে চলে আসতো। আসন্ন বিপদের আভাস পেয়ে কিছুটা বিপদগ্রস্থ বালকের মতো বারকয়েক 'সরি' বলেও যখন খুবএকটা কাজ হল না তখন অগত্যা পরাজয় শিকার করা ব্যাতিত আর কিছুই করার থাকলো না লালের।

প্রতিপক্ষ যে তর্কে পরাজিত হয়েছে তাতে আর কোনো সন্দেহ ছিল না মিষ্টির। কাজেই এবার কিছুটা সুর নরম করে কথা বলা আবশ্যক।

-"ঠিক আছে, ঠিক আছে। আর অত নাটক করতে হবে না। ..... পুজোয় কোথায় যাবি কিছু ঠিক করলি?"

-"এতে আবার এতো ভাববার কি আছে?.... কলকাতায় যেকোনো কোথাও গেলেই হয়। "

-"জীবনে কি কোনোকিছু নিয়ে একটু সিরিয়াস হতে পারবি না?!! আমি কোথায় সকাল থেকে মাথা ঘামিয়ে যাচ্ছি পুজোর প্ল্যানিং নিয়ে আর এদিকে তোর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই !... তুই খুব ভালো করেই জানিস যে আমি কলকাতার রাস্তাঘাট প্রায় চিনি না বললেই হয়। "

-"আচ্ছা তাহলে আমাকে একটু সময় দে, আমি আজকের মধ্যেই একটা কিছু প্ল্যান করে ফেলবো। "

এতক্ষনে লালের কথা শুনে কিছুটা আশ্স্বস্ত হল মিষ্টি।

"তোর জন্যে একটা গিফট আছে। .... আজ দেখা করতে পারবি ?"

"গিফট? কিসের গিফট?... আবার এসব করতে গেলি কেন?.... তুই থাকতে আবার আমার কোন গিফটের প্রয়োজন বল তো?" আমাদের লাল কুমার অনেকটা চাপা স্বভাবের হলেও মাঝেমাঝে 'ফ্লার্ট' বেশ ভালোই করতে পারে। এরম একটা কথা শুনে মিষ্টির ফর্সা গাল যেনো মুহূর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে গেল। মুচকি হেসে ধীর কণ্ঠে সে বললে- "আমি অতশত জানি না। দেখা করবি কি না বল। "

এতদিনে মিষ্টির সাথে সাক্ষাৎ করার কোনো সুযোগ ভুল করেও ছাড়েনি লাল, আজও তার অন্যথা হল না। বেলা অনেক হয়েছে, স্নান সেরে এবার নিচে যেতে হবে, তাই মিষ্টির প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে, বিকেল পাঁচটা নাগাদ দেখা করার পরিকল্পনা করে সে অবশেষে ফোন রাখতে উদ্যত হল।

বাঙালিদের মধ্যে পুজোর সময় সেই উপলক্ষে জামা কাপড় কেনার জন্যে আত্মীয়বর্গের ছোটোদের টাকা দেওয়ার প্রথা আছে। প্রত্যেক বছর এই পুজোর সময় মিষ্টির কাকা এবং দুই মামার থেকে প্রায় ২০০০-৩০০০ টাকা পাওনা হয়। সেই ধনরাশির পুরোটা জামা কিনে ব্যায় করে না সে। এইবার তাই কিছুদিন আগেই হরিতলার পাঞ্জাবি মিউজিয়াম থেকে, কলেজ থেকে ফেরার পথে, লালের জন্যে একটা সুন্দর নীল রঙের পাঞ্জাবি কিনেছে মিষ্টি। খুব সাবধানে সেটাকে আলমারির উপরে লুকিয়ে রেখেছে, দাদু-ঠাম্মির নজরের আড়ালে। তারা টের পেলে যে সর্বনাশ হবে সেটা আর আলাদা করে বলার আশা করি প্রয়োজন নেই !

এদিকে রায় বাড়িতে লাল পরল মহা বিভ্রান্তিতে। সে যে মিষ্টির জন্যে কিছুই কেনেনি! এই অল্প সময়ে এই সমস্যার সমাধান কিভাবে করা যায় সেই নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে ভাতের থালায় মাংসের টুকরোটা লাট্টুর মতো আঙ্গুল দিয়ে ঘুরিয়ে যাচ্ছে সে।

শ্যামল বাবু মানুষটা খুব শান্ত হলেও খাবার নিয়ে অমন ছেলেখেলা তিনি একেবারেই পছন্দ করতেন না। ছেলেকে এক ধমক দিলেন- "খোকা!! এসব কি হচ্ছে!? তোকে আমি কতবার বলেছি যে খাবার নিয়ে ওরম রসিকতা করতে নেই !? মা অন্নপূর্ণা রুষ্ট হন। "

বাবার বকুনিতে সম্মতি ফিরলো লালের। খাওয়া শেষে যখন উঠে হাত ধুতে উদ্যত হল, তখন আরো একবার বাবার কণ্ঠস্বর কানে গেল- "তোর সেই বন্ধুটার খবর কি?"

-"কে? বিজয়?"

-"হুম। ... পুজোর ছুটিতে এসেছে বাড়িতে নাকি ভুবনেশ্বরেই আছে ?"     

 -"না, এবার আর আসেনি। পুজো শেষ হলেই ওর পরীক্ষা। " এইটুকু বলেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল লাল। সত্যিই তো, সে বিজয়ের কথা বেমালুম ভুলে গেছিলো। এই বিপদ থেকে যে একমাত্র সেই প্রানীটাই উদ্ধার করতে পারবে সেটা তো একবার ভেবে দেখা হয়নি। নাহ, এবার তো একবার কল করতেই হবে তাকে।

যেমন চিন্তা তেমন কাজ। ঘরে ঢুকেই তৎক্ষণাৎ ফোনে ডায়েল করে ফেলল বিজয়ের নাম্বার।

-"হ্যালো, বল। আজ হঠাৎ কি মনে করে। "

-"একটা ছোট্ট সমস্যায় পরেছি ভাই।........" তারপর বিস্তারে ঘটনাটা উল্লেখ করে বন্ধুর কাছে উপদেশ প্রার্থনা করল লাল।

পাড়ার বুড়ো জেঠুদের মতো হালকা কেশে গলাটা ঝেড়ে নিয়ে বিদ্যাসাগরের মতো বিজয় প্রস্তুত করল নিজের উপদেশ বাণী- "তবে শোনো বৎস। .... সমস্যাটা তেমন একটা জটিল না। বারাসাত স্টেশনের কাছেই, ওই হেলা-বটতলার দিকে যে রাস্তাটা চলে গেছে, ওখানে একটা মেয়েদের জুয়েলারি শপ আছে। ওখানে অনেক ভালো ভালো আইটেম পেয়ে যাবি। .... চিন্তা নেই, দোকান তিনটে থেকে খুলে যায়। আশা করি পর্যাপ্ত সময় পেয়ে যাবি কিছু কেনার মতো।"

এর থেকে ভালো সমাধান এই সীমিত সময়ের মধ্যে জোগাড় করা লালের পক্ষে সম্ভব ছিল না। বন্ধুর উত্তম উপদেশে নিশ্চিন্ত হয়ে তাকে ধন্যবাদ জানালো সে। আর চিন্তা নেই, এইবার শুধু অপেক্ষা বিকেল হওয়ার। মাছরাঙা পাখি যেমন মাছ ধরার জন্যে স্থির দৃষ্টিতে জলের দিকে তাকিয়ে থাকে, তার চেয়েও বেশি স্থির ভাবে লাল এবার একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো দেওয়ালে ঝোলানো ব্রিটিশ আমলের ঘড়িটার দিকে। আর মাত্র আধ ঘন্টার অপেক্ষা!

A Heart That Forgot How

I loved just once- no second flame, No echo came, no whispered name. I gave my breath, my pulse, my days, And watched it all just slip away....