গল্প: “চিঠি আসেনি কখনও”
বাড়িটার সামনে একটা ছাতিম গাছ। বয়সে দীনেশবাবুর চেয়ে সামান্যই ছোট হবে। আগে ছেলেমেয়েরা এই গাছের নিচে খেলত, স্ত্রী সন্ধ্যেয় দীপ জ্বেলে রাখত বারান্দায়, আর তিনি চেয়ার পেতে বসে থাকতেন, ছায়া গায়ে মেখে। এখনো বসেন। শুধু পাশে কেউ বসে না।
দীনেশ মিত্র — এক সময়ের বিদ্বান, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, চারপাশে যে মানুষটা থাকলে লোকজন মাথা নোয়াত। আজ অবসরে, একা, নীরব। পাড়ায় তাকে ‘দীনেশ কাকু’ বলে ডাকা হয়, কিন্তু কেউ আর তাঁর কাছে কিছু জানতে চায় না। তাঁর বাড়ির পাশ দিয়ে রোজকার মানুষ হেঁটে যায়, কেউ চোখ মেলে দেখে না।
দীপা, তাঁর স্ত্রী, আজ থেকে ছ’বছর আগে চলে গেছেন। নিজের হাতে চায়ের কাপটা শেষবার বাড়ির বারান্দায় নামিয়ে রেখে বলেছিলেন, “আজ খুব ক্লান্ত লাগছে গো দীনেশ।”
তারপর আর কখনও কিছু বলেননি। হৃদরোগে মৃত্যু হয়েছিল। খুব বেশি নাটক কিছু ছিল না, শুধু নিঃশব্দ একটা হাহাকার, যা এখনও চারপাশে রয়ে গেছে।
ছেলে অরিত্র এখন কানাডায়। চমৎকার চাকরি, বিদেশি বউ, সবই আছে। কিন্তু বাবাকে ফোন করে না।
মেয়ে রিমি দক্ষিণ কলকাতায়, বিবাহিত, ছোট একটা ফ্ল্যাটে থাকে। প্রথম প্রথম আসত, এখন বলে —
“বাবা, অফিস,
বাচ্চা, সংসার—এতো সময় পাই না!”
এখন রিমির সঙ্গে কথা হয় বছরে দু’বার — পয়লা বৈশাখে আর জন্মদিনে। তাও ফোনের ওপার থেকে চাপা ব্যস্ততা, যেন কথা বলাও একটা দায়িত্ব।
একদিন পাড়ার ছেলে অনিক এসে জিজ্ঞেস করেছিল, “কাকু, আপনি সারাদিন একা থাকেন না? কষ্ট হয় না?”
তিনি একটু হেসে বলেছিলেন —
“একাকীত্ব একধরনের অভ্যেস, অনিক। প্রথমে দুঃসহ, তারপর স্বাভাবিক। শেষমেশ, নিজের অস্তিত্বটাই অবহেলিত মনে হয়।”
তারপর একটু থেমে বলেন,
“আমি একা নই, আমি ফেলনা।”
ভোর পাঁচটায় ওঠেন। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজে না, তবুও অভ্যেসে চোখ খুলে যায়। একটা পুরনো কাঠের রেডিও, যা মাঝে মাঝে খট করে থেমে যায় — সেটাই সঙ্গী। ভাত নিজেই রান্না করেন। খাওয়ার পরে নিজেই ধুয়ে রাখেন থালা। দুপুরবেলা বিছানায় কিছুক্ষণ শুয়ে থাকেন, কিন্তু ঘুম আসে না। তারপরে বিকেলে ছাতিম গাছের নিচে বসে থাকেন।
প্রতিদিন দুপুরে একজন মহিলা আসে—ঝরনা। আগে মাসে দুবার আসত, এখন সপ্তাহে একদিন। আসে ধুলো ঝাড়তে, কাপড় কাচতে। একদিন বলেছিল,
“কাকু, আপনার ছেলেমেয়েরা কি আপনাকে ভুলে গেছে?”
দীনেশবাবু তার দিকে তাকিয়েছিলেন। মুখে কোনো অভিমান ছিল না।
“না মা, আমি বিশ্বাস করি, তারা এখনও মনে রাখে... শুধু হয়তো সময়টা পায় না।”
কিন্তু সেই সময়টা আর এল না।
বাড়ির একটা ঘর আছে — যেটা আগে ছিল মেয়ের ঘর। এখন তালা দেওয়া থাকে। একদিন সেই তালা খুলে, তিনি পুরনো বইগুলোর ভেতরে হাত রাখলেন। পুরনো একটা ডায়েরি পেলেন। মেয়ের হাতের লেখা। পড়তে গিয়ে থমকে গেলেন —
“বাবা, তুমি আমার হিরো। তোমার মতো মানুষ হতে চাই আমি।”
দীনেশবাবুর চোখ ভিজে ওঠে। এখনকার রিমি তাঁকে ফোন করতেও ভুলে যায়।
ছেলের ঘরের বইয়ের তাকেও আর ছোঁয়া হয় না। একবার ছেলের পাঠানো একটা পার্সেল পেয়েছিলেন — ভেতরে একটা শীতের সোয়েটার।
কিন্তু চিঠি কিছু ছিল না।
এই সমাজে এখন বুড়োরা যেন এক অদৃশ্য শ্রেণি।
তাঁদের অভিজ্ঞতা অপ্রাসঙ্গিক, তাঁদের স্মৃতি বোঝা মনে হয়, আর ভালোবাসা শুধু তখনই থাকে, যখন তাঁর কাছে কিছু পাওয়ার থাকে।
ছোটবেলায় ছেলে অসুস্থ হলে রাতভর পাশে বসে থেকেছিলেন দীনেশ। এখন নিজের ওষুধ খেয়েছেন কি না, তা জিজ্ঞেস করার মতো কেউ নেই।
তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেন,
“এই সমাজ কি শুধু তরুণদের জন্য? যেখানে বৃদ্ধেরা হয়ে ওঠে একটা অপেক্ষার অনুচ্চার ধ্বনি?”
একদিন রাতে,
অনেক ভেবেচিন্তে দীনেশবাবু একটা চিঠি লিখলেন।
প্রাপক: অরিত্র ও রিমি।
“আমার প্রিয় সন্তান,
জানি, তোমরা সুখে আছো। হয়তো আমার কথা মনে পড়ে না, আবার হয়তো মাঝে মাঝে পড়েও যায়।
আমি এখন খুব একা। চুপচাপ দিন যায়, রাত্রি নামে। ঘড়ির কাঁটা ঘোরে, ঘরের দেয়াল বয়ে চলে সময়। কিন্তু আমি তাতে নেই।
আমি আজকাল অনেক ভাবি — বাবা-মা কি সন্তানের জীবনে শুধু একটা প্রয়োজনীয়তা? প্রয়োজন ফুরোলেই স্মৃতি হয়ে যায়?
আমি কষ্টে নেই। অভাব নেই। শুধু যে ‘কোথাও কেউ নেই’ — এই উপলব্ধিটা ঘুম পেতে দেয় না।
ভালো থেকো। যদি কোনোদিন সময় পাও, একটা চিঠি দিও। আমি অপেক্ষা করব।
– তোমাদের বাবা।”
চিঠিটা পোস্ট করা হয়নি। টেবিলের ড্রয়ারে রাখা। কারণ তিনি জানেন, কেউ পড়বে না।
ঝরনা একদিন সকালে এসে দেখে, দরজা খোলা। দীনেশবাবু টেবিলের ওপর মাথা রেখে বসে আছেন।
চোখ দুটো খোলা, মুখে একধরনের প্রশান্তি। যেন অপেক্ষার সমাপ্তি হয়েছে।
টেবিলের ওপর রাখা সেই চিঠি, আর এক কাপ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চা।
কেউ চিঠিটা খুলে দেখে না। পুলিশ আসে, প্রতিবেশীরা আসে। পাড়ায় কানাকানি —
“একা মানুষ ছিল, চলে গেল… কেউ কিছু জানত না!”
মেয়ে ফোন করে পরদিন। ছেলে তিনদিন পরে আসে। ফ্ল্যাট বিক্রি করে, ব্যাংকের কাজ সেরে ফিরে যায়।
শুধু ছাতিম গাছটা থেকে যায়। আর জানালার পাশে একটা খালি চেয়ার, যা অপেক্ষা করে কারও না আসার।
“কিছু কিছু মানুষকে কেউ ফেলে দেয় না — তারা নিজেরাই অতীত হয়ে যায়।
এবং অতীতেরা চিঠি পায় না।”_
No comments:
Post a Comment