নৃত্যের হত্যামঞ্চ (লেখক- সৌহার্দ্য সমাদ্দার)
পর্ব ১: "আমি কে?"
বাণীপুর — যেন একটা ঘুমন্ত গ্রামের নাম, যেটা রাতুলের কাছে একটা দুঃস্বপ্নের নাম হয়ে উঠেছিল। চারদিক খালি মাঠ, খালের পাড়, কলার ঝোপ, আর মন্দিরের ঘন্টাধ্বনি। অথচ এমন এক গ্রাম, যেখানে ছোট্ট একটা ঘরের ভেতর প্রতিদিন মরত একটা মন।
রাতুল — বয়স পনেরোর কাছাকাছি। হ্যাঁ, জন্মসূত্রে ছেলে, কিন্তু ওর চেহারা, গলার স্বর, হাঁটার ভঙ্গি, কথা বলার ধরন—সবকিছুতেই ছিল এক নারীর কোমল ছাপ। ওর কণ্ঠে ছিল এক নরম সুর, চোখে ছিল লাজুক চাহনি। সমাজের চোখে সেটা ছিল 'অস্বাভাবিক', 'অসুস্থ', 'অবৈধ'।
স্কুলে একদিন শিক্ষক ডেকে বলেছিলেন,
— “তুই কথা বলিস এমন ভাবে কেন? ছেলেদের মতো কথা বল, হাঁটতে শেখ!”
ক্লাসের ছেলেমেয়েরা হেসে উঠেছিল। কারও মুখে ছিল বিদ্রুপ, কারও মুখে ঘৃণা। একে একে সবাই ওকে একটা নামে ডাকতে শুরু করল —
“হিজড়া রাতুল”।
প্রথমদিকে ও প্রতিবাদ করেছিল, কেঁদেছিল, কিন্তু শেষমেশ ও বুঝেছিল — এই সমাজে ওর কণ্ঠ কেউ শুনতে চায় না।
স্কুলের পর একদিন মাঠে খেলতে গিয়ে কিছু ছেলে ওকে ধরে নিয়ে গিয়ে ঘাড়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। কেউ বলেছিল,
— “তুই নাচিস কেন? তুই ছেলের জাত নষ্ট করছিস!”
— “তোর মত হিজড়া দেখে মাথা ঘুরে যায় রে!”
একটা কাদা ভর্তি গর্তে মুখ গুঁজে পড়ে ছিল রাতুল। গালে কাঁটা ফুটেছিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি রক্ত ঝরেছিল ওর আত্মায়।
ওর একটাই আশ্রয় ছিল — নাচ। ঘরের কোণে রাখা একটা ফাটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘুঙুর বাঁধত ও। পায়ে বাঁধা সেই শব্দটাই ছিল ওর আত্মপরিচয়ের ভাষা। কোনোদিন কোমরে শাড়ির আঁচল বেঁধে, কখনো রঙিন ওড়না জড়িয়ে সে নাচত — রবীন্দ্রসংগীত, কীর্তন, এমনকি সিনেমার গানেও।
"এই পথ যদি না শেষ হয়..." — এই গানটা চালু হলে ঘরের ভেতর আলাদা আলো এসে পড়ত মনে হতো।
নাচতে নাচতে ও প্রায় ভুলে যেত নিজের পরিচয়। নিজেকে শুধু একটা মানুষ মনে হতো — কারও ছেলে, কারও মেয়ে না — শুধুই একজন মন।
কিন্তু এমন স্বপ্নের আকাশও বেশি দিন খোলা থাকেনি।
রাতুলের বাবা একদিন ওর পায়ে ঘুঙুর বাঁধা দেখে হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠেন।
— “আমার ঘরে আমি হিজড়া পুষিনি! তুই কী অপদার্থ!”
সেদিন রাতেই বাবা চলে যায় — আর ফেরেনি কখনো। লোকমুখে শোনা গেল শহরে চাকরি নিয়ে এক নতুন সংসার পেতেছে। কেউ কেউ বলে — “বেটার লজ্জা লাগত রে! ছেলে না মেয়ে কিছু বোঝা যায় না!”
মা প্রথমে চুপ করে সহ্য করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনিও সমাজের বিষে জর্জরিত হয়ে পড়লেন। চাষের মাঠে কাজ করতে গেলে লোকেরা ছুঁতো না, হাটে গেলে পেছনে পিছনে কটু কথা বলত।
একদিন রাতুল দরজার আড়াল থেকে শুনে ফেলল — মা বলছে এক আত্মীয়কে,
— “আমি জানি না ও আমার কেমন সন্তান… মুখ দেখাতে পারি না কোথাও…”
তারপর একদিন সকালে ঘুম ভেঙে দেখে — ঘরে কেউ নেই। শুধু কাঁথার নিচে মায়ের এক চিরকুট:
"ক্ষমা করিস, আমি আর পারছি না। তোকে নিয়ে বাঁচা অসম্ভব।"
রাতুল সেই দিনটায় একেবারে ভেঙে পড়েছিল। ওর চারপাশের দেওয়ালগুলো যেন ধসে পড়ল, যেন কোনও মঞ্চের পেছনের পর্দা কেউ হঠাৎ ছিঁড়ে ফেলল।
তবু একটা নাম ছিল, যে ছোটবেলা থেকে ছিল একমাত্র বন্ধুর মতো — মিঠাই।
মিঠাই, ওর প্রতিবেশী,
খেলার সাথী, গাছ থেকে কাঁচা আম পাড়ার সঙ্গী। ছোটবেলায় মিঠাই-ই একমাত্র ছিল যে ওকে 'হিজড়া' না বলে 'রাতুলদা' বলে ডাকত। স্কুলে কেউ মেরেছে শুনলেই মিঠাই লাঠি নিয়ে ছুটে যেত।
ওরা একসাথে নাচ শিখত — ওদের মাঝে কোনো লজ্জা ছিল না।
কিন্তু সময় বদলায়। মেয়েরা যখন বড় হয়, তাদের বলা হয় “ভালো মেয়ে” হওয়ার নিয়ম।
মিঠাই বদলে যেতে লাগল। মুখে মুখে রঙ, জামায় জামায় সমাজের অনুমোদন।
একদিন রাতুল ওকে জিজ্ঞেস করেছিল —
“তুই আজকাল আমাকে দেখলে কথা বলিস না কেন?”
মিঠাই ঠান্ডা চোখে বলেছিল,
“তোর সাথে বেশি মিশলে আমার বিয়ে হবে না রে। সবাই বলে আমি নাকি তোর মতো হয়ে যাবো…”
সেই দিন রাতুল আর কাঁদেনি। চোখ শুকিয়ে গেছিল।
একটা পুরনো ডায়েরি ছিল ওর, যেখানে ও প্রতিদিন লিখত — নিজের কথা, নিজের নাচের ধারা, স্বপ্নের কাহিনি, একটা ‘স্বীকৃতির দেশে’ চলে যাওয়ার পরিকল্পনা। কিন্তু স্বপ্নেও মানুষ বারবার অস্বীকার পেলে, স্বপ্নও একসময় ফুরিয়ে যায়।
রাতুল ঘরে বসে শেষ চিঠিটা লিখল—
"আমি আর কেউ না। আমি রাতুল ছিলাম, যাকে তোমরা কেউ বোঝোনি। আমি শুধু নাচতে চেয়েছিলাম, ভালোবাসা চেয়েছিলাম।"
"যদি আর কোনো জন্ম থাকে, সেখানেও যেন আমি এমনই হই — যেন নিজেকে লুকোতে না হয়।"
পর্ব ২: শেষ নৃত্য
রাতুলের ঘরটা এখন আর আগের মতো কোলাহলপূর্ণ নয়। এক সময়ে ঘুঙুরের ছমছম শব্দে ভরে উঠত মাটির মেঝে, এখন সেখানে শুধু স্তব্ধতা।
ছোট্ট একটা ট্রাঙ্কে ওর একমাত্র সম্পদগুলো রাখা —
একজোড়া পুরনো ঘুঙুর, ছেঁড়া ওড়না, মা’র ফেলে যাওয়া শাড়ির আঁচল, আর একটা ডায়েরি, যেটার পৃষ্ঠাগুলো রঙিন কষ্টে ভরা।
প্রতিদিন ও খালের পাড়ে গিয়ে বসে। জল দেখে, বাতাসের গায়ে হাত বুলিয়ে ভাবে — এই জল কি কাউকে গিলে ফেলতে পারে?
গ্রামের লোকজন আজকাল ওর দিকে তাকিয়েও না। কেউ কেউ দূর থেকে আঙুল তোলে, কেউ ফিসফিস করে বলে,
— “ও এখন একা থাকে না? মা-বাবা তো ছেড়েই দিয়েছে।”
— “এইটা না হলে কি কেউ বাড়ি ছাড়ে?”
রাতুল শুনতে পায় সব। প্রতিটি কথা যেন গালে একেকটা চড়। ওর দেহে যতটা আঘাত পড়েছে, তার চেয়েও বেশি পড়েছে মনে।
একদিন দুপুরে ওর ঘরের দরজায় একটা থুড়ি পড়ে থাকা পত্র পেল। কে যেন লিখেছে —
"তুই একটা অভিশাপ। তোর মতোদের জন্যই সমাজ নষ্ট হচ্ছে। তুই মরেই যা।"
রাতুল হাতে নিয়ে পত্রটা পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। হঠাৎ করে উঠে গেল খাট থেকে, ট্রাঙ্ক খুলে ঘুঙুর বের করল। বহুদিন ও ঘুঙুর বাঁধেনি। আজ আবার জড়িয়ে নিল সেই পুরনো কোমরের আঁচল, আর পায়ে বেঁধে ফেলল ঘুঙুর।
ঘুঙুরের ঠুনঠুন আওয়াজে যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠল ওর আত্মা।
রেডিওটা চালিয়ে দিল — খুব অস্পষ্ট সুর, তবু চিনে নেওয়া যায়।
" যখন
পরবে না মোর পায়ের চিহ্ন...”
ঘরের মধ্যে নৃত্য শুরু করল রাতুল — একা, নিঃসঙ্গ, অথচ অনবদ্য। ওর চোখে জল, তবুও মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
ওর হাত দুটো বাতাসে ভেসে বেড়াল, যেন কোন অতল শূন্যতায় পৌঁছানোর চেষ্টা।
প্রতিটি ভঙ্গিমায়,
প্রতিটি ধাপে, ও যেন নিজেকে ভুলে যাচ্ছিল। যাকে সমাজ হিজড়া বলে ঠেলে দিয়েছে অন্ধকারে, সে যেন আলোয় উঠে এসে বলছে —
"আমি নই তোমাদের লজ্জা, আমি নই অভিশাপ। তোমরা অন্ধ ছিলে, আমি নয়।"
সন্ধ্যা নেমে এলো। খাল পেরিয়ে সূর্য রক্তিম হয়ে যাচ্ছে।
রাতুল ঘর থেকে বেরোল। গায়ে একটা ওড়না, হাতে একটা পুরনো ডায়েরি, পায়ে বাঁধা ঘুঙুর। গন্তব্য — খালের ধারে, ওর ‘স্টেজ’।
ওখানে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল। পেছনে পাখির ডাক, দূর থেকে মন্দিরের ঘন্টা, হাওয়ার মৃদু শোঁ শোঁ শব্দ। এই প্রথমবার সে কোনো দর্শক ছাড়া নাচবে না — কারণ দর্শক আর নেই। কেউ ছিল না, কেউ চায়নি ওর নাচ দেখতে।
কিন্তু সেই রাতে চাঁদের আলো ছিল ওর দর্শক।
ও শেষবারের মতো নাচতে শুরু করল — পুরো হৃদয় খুলে, শরীরের প্রতিটি কোষ দিয়ে। ঘুঙুরের আওয়াজ যেন ঝড় তুলল বাতাসে। জল কাঁপতে লাগল, কচুরিপানা দুলে উঠল।
ওর নাচে ছিল কান্না, অভিমান, স্বপ্নভঙ্গ, আর একরাশ শান্তি।
শেষতক সে চুপচাপ ডায়েরির এক পৃষ্ঠায় ছোট্ট করে লিখল —
"আমি হেরে যাইনি, তোমরাই আমায় তাড়িয়ে দিয়েছো। তোমরা আমায় ভালোবাসতে পারনি। আমি শুধু নিজেকে ভালোবাসতাম।"
"আজ আমি চলে যাচ্ছি, কিন্তু আমি জানি আমি কে। আমি নৃত্যশিল্পী। আমি রাতুল।"
তারপর ঘুঙুর-পরা পায়ে খালের জলে নামল।
একটা জলোচ্ছ্বাস — তারপর নিস্তব্ধতা।
পরদিন সকালে খবর ছড়িয়ে পড়ে — খালের ধারে রাতুলের দেহ ভেসে উঠেছে। লোকজন ছুটে আসে। কেউ বলে, “পাপের সাজা পেয়েছে”, কেউ মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়।
কিন্তু কিছু ছেলেমেয়ের চোখে জল ছিল। একটা মেয়ে, যে একসময় বন্ধু ছিল — মিঠাই — দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল। চোখে হালকা জল, তবু সামনে আসেনি।
শুধু একটা জিনিস কেউ তুলে আনেনি — খালের কিনারায় রয়ে গিয়েছিল একজোড়া ভেজা ঘুঙুর। তার পাশে একটা ডায়েরি, আর একটা রেডিও, যা তখনও চলছিল।
"আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ..."
রাতুল মরে গেল, কিন্তু ওর নাচ বেঁচে রইল।
এই সমাজ প্রতিদিন রাতুলদের গড়ে তোলে — আবার প্রতিদিনই মেরে ফেলে। যে সমাজ শুধু শরীর দেখে, আত্মা দেখে না; যে সমাজ কেবল ‘ছেলে’ না ‘মেয়ে’ বোঝে, ‘মানুষ’ নয়।
তবু একদিন,
যদি কেউ রাত্রির নিস্তব্ধতায় শোনে — খালের ধারে কেউ ঘুঙুর পরে নাচছে…
জেনে নিও, ও রাতুল… ফিরে এসেছে।
পর্ব ৩: ঘুঙুরের আওয়াজ
রাতুলের মৃত্যুর পর বেশ কিছুদিন গ্রামে এক ধরনের ভারী নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল। কেউ কিছু বলত না, কেউ চোখে চোখ রাখত না। শুধু খালের পাশ দিয়ে কেউ আর যেত না রাতে।
খালের জল যেন ঘন হয়ে উঠেছিল, আর পাড়ের কচুরিপানার মাঝখান থেকে মাঝে মাঝে শোনা যেত অদ্ভুত এক শব্দ — ঘুঙুরের ছমছম।
প্রথমে লোকে গুরুত্ব দেয়নি। বলেছিল,
— “জলের শব্দ, আর কিছু না।”
— “ওরকম একটা ছেলে মরেছে, একটু ভয় পাওয়াই স্বাভাবিক।”
কিন্তু তার পর থেকে ঘটতে লাগল কিছু এমন ঘটনা, যা কেউ ব্যাখ্যা করতে পারল না।
প্রথম মৃত্যু হয়েছিল গণেশ কারিগরের — যিনি জীবদ্দশায় রাতুলকে জুতো ছুড়ে মেরেছিলেন পুকুরপাড়ে। এক রাতে তাঁর স্ত্রী চিৎকার করে সবাইকে ডেকেছিলেন —
— “ওর পা চলে গেছিল ঘরের বাইরে! ঘুমের মধ্যে হাঁটছিল!”
লোকজন ছুটে যায়। কিন্তু গণেশবাবু আর ফেরেননি।
পরদিন সকালে তাঁর লাশ পাওয়া গেল খালের পাড়ে — মুখে একটা অদ্ভুত হাসি, চোখ দুটো খোলা, আর পায়ে বাঁধা ছিল…
ঘুঙুর।
পুলিশ এসে বলেছিল — “হয়তো আত্মহত্যা।”
কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল মৃত্যুর সংখ্যা। কেউ রাতের বেলা হঠাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে খালের দিকে যেত, কেউ বা ঘুমের মধ্যেই হেঁটে চলে যেত মাঠের দিকে।
আর প্রত্যেক মৃত্যুর পরে এক জিনিস ছিল অপরিবর্তিত —
মৃতের পায়ে পাওয়া যেত একটি পুরনো ঘুঙুর।
বয়স্ক লোকজন বলতে লাগল —
— “রাতুল ফিরে এসেছে।”
— “ও হিজড়া ছিল না, ও একটা অভিশপ্ত আত্মা হয়ে গেছে।”
— “ওর আত্মা খাল থেকে ডাকে... যে শোনে, সে মরে।”
কিন্তু এটা শুধু গুজব নয় — রাতুল সত্যিই ফিরে এসেছিল।
পিশাচ রূপে।
রাতুলের আত্মা বাঁধা ছিল সেই ঘুঙুরের আওয়াজে। প্রতিদিন মধ্যরাতের পর খালের পাশে শোনা যেত সেই তাল — ঠুং ঠুং ঠাং… যেন কারও শরীর ঘুরছে, নাচছে, বাতাসে এক অভিশপ্ত ছন্দ ভেসে বেড়াচ্ছে।
প্রথমে আওয়াজটা হালকা থাকত, তারপর ধীরে ধীরে তীব্র হতে থাকত। আর যে কেউ সেটা একবার শুনলে — তার চোখে একরকম ঘোর এসে যেত।
একে একে লোকেরা হারিয়ে যেতে লাগল সেই ছন্দে — মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে হাঁটত খালের দিকে, যেন কারও ডাকে সাড়া দিচ্ছে।
এক রাতের কথা। কিশোরী পলতু — যে একদিন স্কুলে রাতুলকে 'হিজড়া' বলে চিৎকার করে অপমান করেছিল, সে উঠেছিল ঘুম থেকে, আর দেখতে পায় তার জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কেউ।
শরীর জড়িয়ে একপাটি ওড়না, চোখে ঘোর লাগানো দৃষ্টি, আর পায়ে বাঁধা ঘুঙুর। ধীরে ধীরে সেই অদ্ভুত সত্তা নাচতে থাকে। নীরব নৃত্য — চোখের ভাষায় প্রশ্ন, শরীরের ভাষায় অভিশাপ।
পলতু দরজা খুলে বাইরে আসে… তারপর… আর কোনোদিন ফেরেনি।
পরদিন পাড়ার ছেলেরা দেখে — খালের জলে ভাসছে ওর দেহ, ঠোঁটে রক্তের রেখা, আর গলায় বাঁধা একটা লাল ওড়না।
গ্রাম উত্তাল হয়ে উঠল। কেউ বলল —
— “ও পিশাচ!”
— “ও আমাদের পাপের ফল!”
— “ওকে শান্ত না করলে সব মারা যাবে!”
পুরুত ডাকা হলো। তান্ত্রিকও এল। খালের পাশে হোম করা হল। ঘুঙুর পোড়ানো হল। কিন্তু কিছুই কাজ করল না।
কারণ পিশাচ তো রক্ত চায় না… সে চায় স্বীকৃতি।
রাতুল ফিরে এসেছে তার অস্তিত্ব দাবি করতে। সমাজ তাকে মরতে বাধ্য করেছিল — কিন্তু মৃত্যুর পর সে ফিরে এসেছে সেই সমাজের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলতে।
এখন ওর নাচ আর কারও মনোরঞ্জনের জন্য নয়। এখন সেটা প্রতিশোধের জন্য।
একদিন গভীর রাতে গ্রামের নবীন শিক্ষক সঞ্জয়বাবু একটা চিঠি লেখেন —
"আমি জানি, আমি তাকে একদিন বলেছিলাম — 'তুই অসভ্য'। ওর চোখে জল দেখেছিলাম। আজ আমি ওই ঘুঙুর শুনেছি। ও ডেকেছে। আমি যাচ্ছি।"
সঞ্জয়বাবুর দেহ পাওয়া গিয়েছিল মাঠের মাঝখানে, দু’হাত প্রসারিত করে নৃত্যরত অবস্থায়। শরীর শক্ত হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু চোখ ছিল খোলা — আর মুখে ছিল শান্তির ছাপ।
এরপর থেকে কেউ আর রাতের পর বাইরে বের হয় না। খাল শুকিয়ে গেছে, কিন্তু রাতুলের ঘুঙুরের আওয়াজ এখনও ভেসে আসে। যেন বাতাসের মাঝে তার উপস্থিতি মিশে গেছে।
কেউ কেউ এখনো রাতে ঘুমের ঘোরে ভাবে — কে যেন ওদের ডাকছে।
“এই পথ যদি না শেষ হয়…”
ওর নাচ শেষ হয়নি।
ও এখনো ফিরে আসে…
ঘুঙুর পায়ে, চোখে অভিমান, আর নাচে প্রতিশোধ।
পর্ব ৪: অগ্নিসন্ধান
রাতুলের ঘুঙুরের আওয়াজ এখন বাণীপুরে এক আতঙ্কের নাম। রাত নামলেই জানালাগুলো বন্ধ হয়ে যায়, শিশুরা কাঁদে ঘুমের মধ্যে, আর প্রৌঢ়রা রাতজেগে বসে থাকে আগরবাতি জ্বালিয়ে, ঠাকুরের মূর্তির দিকে তাকিয়ে।
তবু ঘুঙুর থামে না।
তালটা ধীরে ধীরে যেন বদলে গেছে — সেটা এখন আর নাচ নয়, বরং যুদ্ধের ডঙ্কা।
বাণীপুরে প্রতিদিন কেউ না কেউ নিখোঁজ হয়। কারও চোখ গলে যায়, কারও শরীর পুড়ে যায় রক্তছাপহীনভাবে। আর পায়ে বাঁধা ঘুঙুরের ছাপ রয়ে যায় মৃত্যুর নিস্তব্ধ প্রান্তরে।
বসন্তের ঠিক আগে এক অন্ধকার মেঘলা সকালে একটা বস্ত্রাবৃত মেঘলা চেহারা হেঁটে আসে গ্রামের ভিতর দিকে। চুল জটাবদ্ধ, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে রক্তমিশ্র চন্দনের তিলক।
কেউ চেনে না তাঁকে, কিন্তু তিনি সরাসরি এসে দাঁড়ান পুরোনো স্কুলঘরের সামনে, যেখান থেকে প্রথম ঘুঙুরের আওয়াজ শোনা গিয়েছিল একরাতে।
তার নাম — শ্যামাপ্রসাদ চক্রবর্তী।
এক ঘোরতর তান্ত্রিক, যিনি কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বহু স্থানে 'অশুভ আত্মা' বন্ধনের জন্য প্রসিদ্ধ।
লোকেরা প্রথমে কিছু বলত না, সন্দেহ করত, কিন্তু তাঁর চোখের দৃষ্টি ও কণ্ঠের ভার কেউ অস্বীকার করতে পারল না।
তিনি এসে বললেন —
“তোমরা এক পবিত্র আত্মাকে কুকুরের মতো ঠেলে দিয়েছো মৃত্যুর দিকে। এখন সে ফিরে এসেছে সত্য নিয়ে, কিন্তু রূপ নিয়েছে অন্ধ প্রতিশোধের। এখন তাকে মুক্ত করতে হবে — নয়তো গ্রামটাই আর থাকবে না।”
শ্যামাপ্রসাদ মন্দিরের পাশের এক পরিত্যক্ত গোদামে নিজের আস্তানা গড়ে তুললেন। আর শুরু করলেন প্রস্তুতি — তন্ত্রক্রীয়ার।
প্রথমেই তিনি খুঁজে বের করলেন — রাতুলের ঘুঙুর, রেডিও, ও সেই ডায়েরি।
তাঁর বিশ্বাস ছিল — আত্মা নিজের চিহ্নে বাঁধা থাকে।
তান্ত্রিক শ্যামাপ্রসাদ অন্ধকার রাত্রিতে শুরু করলেন ‘সাধন’।
তাঁর কাছে ছিল গুঁড়ো লাল চন্দন, কাশ্মীরী শ্মশান থেকে আনা ছাই, কালী মূর্তির পদতলে রাখা পবিত্র রক্তমালা — সব একত্র করে তিনি রচনা করলেন এক তান্ত্রিক যন্ত্রমণ্ডল।
তিনি বসালেন মাঝখানে একটি প্রদীপ, যার শিখা কখনও নীল হতো, কখনও রক্তবর্ণ। চারপাশে আঁকলেন উল্কাপিণ্ডের ছায়া, আর প্রতিটি বিন্দুতে বেঁধে রাখলেন ঘুঙুরের ছিঁড়ে যাওয়া দানা।
সেই যন্ত্রমণ্ডলের ঠিক মাঝখানে রেখে দিলেন রাতুলের ডায়েরি — যেখানে ছিল ওর শেষ চিঠি।
সন্ধ্যায় প্রথম 'ডাক' এল — চারদিকে নেমে এলো নিঃশব্দতা, আর তারপর কাঁপতে লাগল বাতাস। এমনভাবে, যেন কেউ হেঁটে আসছে। ঘুঙুর বাজতে লাগল।
শ্যামাপ্রসাদ কপালে তিলক আঁকলেন, দু’হাতে ধরে বসলেন ত্রিশূল আর পদ্মবীজের
মালা, আর মন্ত্রপাঠ শুরু করলেন —
“কালিকা চেতনা বিভা হি তন্ত্রে
মুক্তিহীন সত্ত্বে পরিণত ক্রোধে
পিনাকিনী! রক্ষা করো মানবজাতি!”
রাতুলের আত্মা ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়াল — বাতাস থেমে গেল।
শরীর ছিল আগুনের ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে, চোখে এক শূন্যতা, গলায় লাল ওড়না, আর পায়ে ঘুঙুর।
কিন্তু এবার সে নাচছিল না।
সে কাঁদছিল।
শ্যামাপ্রসাদ প্রথমবার বললেন,
— “তুই যা চাস বল… আমি শুনছি।”
রাতুল তখন অদ্ভুত এক কণ্ঠে বলে উঠল —
— “আমি নাচতে চেয়েছিলাম। আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম। ওরা আমার পায়ের শব্দকে ঘৃণা করেছিল… এখন আমি তাদের ঘুম কেড়ে নিচ্ছি। ওদের মনে ঘুঙুর ঢুকিয়ে দিচ্ছি — যেন ওরা ভুলতে না পারে।”
পরদিন সকাল — শ্যামাপ্রসাদ ডেকে পাঠালেন সমস্ত গ্রামবাসীদের।
বললেন —
“তোমরা ওকে মারোনি, কিন্তু তোমরা ওর মৃত্যুতে চুপ ছিলে। এখন তার আত্মা তোমাদের উপর অভিশাপ হয়ে আছে। যদি মুক্তি চাও — তবে কেবল তন্ত্র নয়, তোমাদের প্রায়শ্চিত্ত লাগবে।”
কেউ কেউ চিৎকার করে উঠল —
— “আমরা কী করব, ও তো নিজের মতো ছিল!”
— “আমরা কীভাবে জানতাম, এত বড় কিছু হবে!”
শ্রমিক রাধেশ্যাম বলে উঠল —
— “আমি একদিন রাতে ওকে বেঁধে মারি। সে আমার সন্তানকে পানি দিলেও আমি বাধা দিতাম… আমি দোষী!”
এক একজন করে লোক কাঁদতে লাগল —
মিঠাই এল সেই সন্ধ্যায় — চুপ করে দাঁড়াল সামনে, বলল,
— “আমি ওর বন্ধু ছিলাম, কিন্তু আমি ভয় পেয়েছিলাম সমাজকে। আমি ওকে ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমি… ওর মৃত্যুর কারণ। আমাকে শাস্তি দাও।”
শ্যামাপ্রসাদ বললেন —
“ভয় নয়, সত্যই মুক্তি। ওর আত্মা এখনো বাঁচতে চায় — কিন্তু নিজেকে হারিয়েছে। আমরা তাকে যদি ভালবাসা ফিরিয়ে দিতে পারি, তবে হয়তো সে শান্তি পাবে।”
তিনি শুরু করলেন দ্বিতীয় তন্ত্রক্রিয়া —
একটি ত্রিকোণ মণ্ডল, যার তিনটি কোণে তিনজন মানুষকে বসতে হয় — যারা রাতে রাতুলকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
সে তিনজন হল —
১. মিঠাই- বন্ধু যে ওকে ছেড়ে দিয়েছিল,
২. গণেশ কারিগরের স্ত্রী - যিনি ওকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিতেন,
৩. স্কুলশিক্ষক শঙ্করবাবু - যিনি ওর কথা বন্ধ করেছিলেন।
তিনজনকে একসাথে বসিয়ে, তাঁদের মাথায় সিঁদুর দিয়ে 'প্রত্যয়ের চিহ্ন' আঁকলেন। ত্রিশূল ঘোরালেন বাতাসে, আর বললেন —
“ওকে বলো — ওকে ভালোবাসো। আবার ডেকো — যেন সে ফিরে আসে, কিন্তু এবার নৃত্যে নয়, ভালবাসায়।”
তিনজন একসাথে ডেকে উঠলেন —
“রাতুল, ফিরে আয়, এবার আমরা তোকে ভালোবাসব। আমরা ভুল করেছি। আমাদের ক্ষমা করো।”
মাঝখানে শ্যামাপ্রসাদ অগ্নিকুণ্ডে ফেলে দিলেন রাতুলের ঘুঙুর — যেটা দগ্ধ হতে হতে বাজতে লাগল এক অন্তিমবার।
হঠাৎ ঝড় উঠল।
চারদিক ঘিরে ধোঁয়া, ঝাঁকুনি, ভূমিকম্পের মতো শব্দ — মাটির নিচ থেকে যেন কেউ কেঁদে উঠল।
একটা ছায়া উঠে এল খালের দিক থেকে… আর তারপর…
পর্ব ৫: মুক্তি
মেঘে ঢাকা সেই সন্ধ্যায় শ্যামাপ্রসাদের যজ্ঞকুণ্ডের আগুন আকস্মিকভাবে ফ্যাকাশে নীল হয়ে উঠেছিল। বায়ু নিঃশব্দ, পাখিরা হঠাৎ চুপ, গাছগুলো নিঃস্পন্দ — যেন প্রকৃতি নিজেই দম বন্ধ করে অপেক্ষা করছে এক ভয়ঙ্কর মিলনের জন্য।
অগ্নিকুণ্ডের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠতে উঠতে আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে।
তখনই...
একটা নাচের আওয়াজ শুরু হয়— দূরে, খুব দূরে, খালের কিনারা থেকে। প্রথমে মৃদু। তারপর তার তীব্রতা বাড়তে থাকে।
ঠুং… ঠাং… ঠুংঠাংঠাং… ঠাং…
একবার নয়,
কয়েক ডজন ঘুঙুর যেন একসঙ্গে বাজছে।
মাটি কাঁপতে লাগল। বায়ুর ঘূর্ণি ধীরে ধীরে ঘিরে ফেলল যজ্ঞস্থল।
শূন্য থেকে নামল একটা আত্মা— ভেসে উঠল।
ঘাড় বাঁকা,
চোখ দুটো অগ্নিদীপ্ত অথচ শূন্য, পায়ে বাঁধা ঘুঙুর, শরীর ঢেকে রেখেছে এক জ্বলন্ত রঙিন শাড়ির ধোঁয়াময় প্রতিচ্ছবি।
রাতুল।
তবে এবার সে পিশাচরূপে নয়, এক ভগ্ন আত্মার ছায়ারূপে।
তার শরীর থেকে নির্গত হচ্ছিল ধোঁয়া, আর মুখে ছিল… ভয়ংকর বিষণ্ণতা।
শ্যামাপ্রসাদ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকলেন ত্রিশূল হাতে। তাঁর দেহের চারপাশ ঘিরে রুদ্রাক্ষের সুরক্ষা। যজ্ঞের শব্দে গমগম করছিল চারদিক—
“ওঁ কালী কালভৈরবায় নমঃ…
পিশাচোত্তীর্ণে পরমাত্মনায় মুক্তিপথ দীক্ষয়ামি…”
হঠাৎ সেই ছায়া এক ঝাঁকুনিতে যজ্ঞকুণ্ডের সামনে এসে দাঁড়াল।
শুনতে পাওয়া গেল এক ছিন্ন কণ্ঠস্বর—
“আমি শান্তি চাই…
কিন্তু ওরা আমাকে ছিঁড়ে ফেলেছিল।
আমি আর মানুষ নই।”
ঠিক সেই মুহূর্তে যজ্ঞকুণ্ডে একটি বিকট আওয়াজ হলো। আগুন লাফিয়ে উঠল ৭ ফুটের উপর।
মাঠের ভেতরে জোরে ঝড় শুরু হয়ে গেল — যেন রাতুলের তাণ্ডব আবার শুরু হলো।
গ্রামের পশ্চিম দিক থেকে দৌড়ে এল এক বালক— রক্তে ভেজা। তার চোখ দুটো ছিল ফাঁকা।
তার পেছনে ছুটছিল ঘুঙুরধ্বনি।
এক মুহূর্তে গ্রামজুড়ে পাঁচটি ঘর একসাথে আগুনে পুড়ে যেতে শুরু করল।
আকাশে কালো ছায়ারা ঘুরছিল — যেন শত শত পিশাচের আত্মা, রাতুলের সঙ্গে সমবেত।
গ্রামের মহিলারা কাঁদছে, পুরুষেরা মাটিতে শুয়ে কাঁপছে। ছোট ছেলেমেয়েরা মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরেছে।
মিঠাই উঠে দাঁড়াল যজ্ঞস্থলে। চোখে জল। গলায় এক রুদ্রাক্ষের মালা পরে সে হাঁটু গেড়ে বসে বলল—
“রাতুল, আমি ভুল করেছিলাম।
তুই আমার বন্ধু ছিলিস…
আমি তোকে ছেড়ে দিয়েছিলাম…
তুই ক্ষমা কর।”
শ্যামাপ্রসাদ বললেন—
“যে ভালোবাসা তুই কাতর হয়ে খুঁজেছিলি, আজ তারা তোর পায়ে রেখে দিল।”
তিনি এগিয়ে এলেন, যজ্ঞকুণ্ডের ধারে বসালেন মিঠাই, রাধেশ্যাম ও শঙ্করবাবুকে।
তিনজনের গলায় তিনি রক্তচন্দন দিয়ে আঁকলেন ‘তিনরাত্রির প্রেত মুদ্রা’ — যা তন্ত্র মতে চূড়ান্ত ত্যাগস্বরূপ।
এরপর শ্যামাপ্রসাদ শুরু করলেন মোহিনী বীজমন্ত্র—
“ওঁ হ্রীং ক্লীং পিশাচেশ্বরী মহামায়া নমঃ...”
তারপরে বললেন মিঠাইকে—
“গাও। ওর সেই গান যা ও একা নেচেছিল।”
মিঠাই কাঁপতে কাঁপতে গাইতে শুরু করল—
“যখন
পরবে না মোর পায়ের চিহ্ন...”
এক অদ্ভুত শান্তি ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে।
ঘুঙুরের আওয়াজ থেমে গেল।
রাতুল এগিয়ে এল। এবার তার চোখে আগুন ছিল না, বরং জল।
সে ধীরে ধীরে যজ্ঞকুণ্ডের পাশে এসে দাঁড়াল, এবং বলল—
“আমি ভালোবাসা চেয়েছিলাম।
আজ তা পেলাম।
আমি যাবো…”
সে ধীরে ধীরে হাওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে যেতে লাগল। আর তার পায়ের ঘুঙুর— যেটা কেউ ছুঁতেও পারত না— নিজের থেকেই খুলে পড়ে গেল।
শ্যামাপ্রসাদ সেই ঘুঙুরটিকে তুলে নিয়ে কুণ্ডে নিক্ষেপ করলেন।
এক চূড়ান্ত বজ্রধ্বনি— আর তারপর সব নিঃশব্দ।
পরদিন ভোরে গ্রামের আকাশ নীল। খালের জল আবার ঝকঝকে। পাখির ডাক শোনা যায়।
তবে এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল শ্যামাপ্রসাদ। চোখে গভীর বিষণ্ণতা। তিনি ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলেন — আর কেউ তাঁকে থামাল না। কারণ তিনি যা দিয়েছিলেন, তা কোনো সাধারন পুরোহিত দিতে পারে না।
তিনি চলে গেলেন — কিন্তু দিয়ে গেলেন মুক্তি।
মিঠাই আজকাল খালের ধারে একটি ছোট নাচঘর বানিয়েছে। সেখানে গ্রামের ছেলেমেয়েরা নাচ শেখে।
ঘুঙুর পরে।
আর নাচঘরের উপর বড় করে লেখা —
“রাতুল স্মৃতি নৃত্যশালা”
আর ঠিক ভেতরের দেয়ালে লেখা:
"যাকে আমরা বুঝতে পারিনি, সে আমাদের বোঝাতে এসেছিল — নিজের মৃত্যু দিয়ে। আমরা ওকে মারিনি, কিন্তু ভালোও বাসিনি।
আজ থেকে আমাদের নাচে অমর হয়ে থাকবে তার নাম- রাতুল।"
No comments:
Post a Comment